একসময় আখতার হুসেন এর লেখা পড়তে পড়তেই কত শিশুর শৈশব কেটেছে। সহজ শব্দ, ছন্দময় বাক্য আর নির্মল হাসির ভেতর দিয়ে তিনি শিশুদের জন্য তৈরি করেছিলেন এক আলাদা পৃথিবী। সেই পৃথিবীর স্রষ্টা, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন আমাদের মাঝে আর নেই।
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ , দুপুরে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি । বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন পরিবারের সদস্য ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন আখতার হুসেন। পরিবার জানিয়েছে, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় এবং রক্তচাপও কমে যায়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাঁকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে বারডেম ও গ্রিন লাইফ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। গত কয়েক দিন ধরেই তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
তাঁর ছেলে প্রমিত হুসেন জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার তেজকুনীপাড়ার কাছে রেলওয়ে কলোনি জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরে মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে সিরাজগঞ্জে, সেখানে স্ত্রী মল্লিকা হুসেনের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।
একজন লেখকের বিদায় কখনো শুধু একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়। আখতার হুসেনের ক্ষেত্রেও তাই। তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের একটি দীর্ঘ অধ্যায়েরও যেন পর্দা নামল।
যার ছড়ায় ছিল শিশুমনের ভাষা
প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন আখতার হুসেন। তাঁর ছড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সরলতা। কঠিন শব্দ বা ভারী বক্তব্য নয়, শিশুর মুখের ভাষার কাছাকাছি শব্দ আর স্বাভাবিক ছন্দেই তিনি গল্প, ছড়া ও কবিতার জগৎ তৈরি করেছেন।
তাঁর লেখা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকেনি। বহু রচনা পাঠ্যপুস্তকে জায়গা করে নিয়েছে। ফলে এক প্রজন্ম নয়, কয়েক প্রজন্মের শিশুর শৈশবের সঙ্গে মিশে গেছে তাঁর লেখা।

‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’ ও ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’সহ তাঁর বহু বই পাঠকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
শুধু মৌলিক লেখা নয়, জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজেও ছিল তাঁর বড় অবদান। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’ এ সর্বাধিক সংখ্যক ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও তাঁর।
মুক্তিযুদ্ধেও ছিল তাঁর কলম
শিশুদের জন্য আনন্দের ছড়া লিখলেও আখতার হুসেনের কলম শুধু শিশুসাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির স্পৃহা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা এবং অজিত রায়ের সুরে তৈরি ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল।
শুধু লেখক হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন তিনি। সংগঠনটির প্রথম দিকের বিভিন্ন নাটক রচনা ও নির্দেশনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে শিশু সংগঠন ‘খেলাঘর’-এর সংগঠক হিসেবে শিশুদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।
ছাত্রজীবনে যুক্ত ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে। খেলাঘর ও উদীচীর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাঁর লেখা সংগীতও বিভিন্ন সাংগঠনিক আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ এমনই একটি পরিচিত সংগঠন সংগীত।
সাংবাদিকতা থেকে সম্পাদনার জগতে
আখতার হুসেনের কর্মজীবনের শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে। তিনি দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন।
পরবর্তী সময়ে সম্পাদনার জগতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথমা প্রকাশনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে অসংখ্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।
নাটোরের গ্রাম থেকে দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা
আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। তাঁর বাবা টি আই এম সিকান্দার রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার চাকরির কারণে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকা খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়াসহ নানা জায়গায়।
গফরগাঁওয়ে তাঁর সাহিত্য জীবনের সূচনা। কুলাউড়ায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম লেখা। শৈশবের সেই ঘুরে বেড়ানো জীবন ও নানা অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর শিশুসাহিত্যের ভেতরে নানা রূপে ফিরে এসেছে।
ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবনীও লিখেছেন তিনি। বাংলা একাডেমির প্রকাশনা তালিকাতেও তাঁর লেখা জীবনীগ্রন্থ রয়েছে।
পুরস্কার এসেছে, থেকে গেছে মানুষের ভালোবাসা
শিশুসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আখতার হুসেন পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির ফেলো।
তবে একজন শিশুসাহিত্যিকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো কোনো পদক নয়। হয়তো সেই শিশুটি, যে বহু বছর পরও তাঁর লেখা কোনো ছড়া মনে করতে পারে। কিংবা কোনো পাঠক, যার শৈশবের বইয়ের পাতায় আজও বেঁচে আছেন আখতার হুসেন।
তিনি চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর লেখা ছড়াগুলো থামল না। শিশুরা যখন তাঁর বইয়ের পাতা খুলবে, কোনো এক সরল ছন্দে আবার ফিরে আসবেন তিনি, একজন লেখক হিসেবে নয়, শৈশবের পরিচিত এক আপন মানুষ হয়ে।
আখতার হুসেন তাই শুধু একটি নাম নন, বাংলাদেশের বহু শিশুর স্মৃতিতে তিনি একটি সময়, একটি ছন্দ, একটি নির্মল শৈশব।









