ভিডিও গেমের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘রেসিডেন্ট ইভিল’ আবারও বড় পর্দায় ফিরেছে নতুন গল্প নিয়ে। তবে এবার নেই পরিচিত চরিত্র অ্যালিস, ক্লেয়ার রেডফিল্ড বা লিওন কেনেডি। গল্পের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে এক সাধারণ মেডিক্যাল কুরিয়ার ব্রায়ানকে, যে একটি সাধারণ ডেলিভারি মিশনে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ ভাইরাস, দানবীয় প্রাণী আর বেঁচে থাকার অসম লড়াইয়ে।
জ্যাক ক্রেগারের পরিচালনায় নির্মিত নতুন ‘রেসিডেন্ট ইভিল’ ছবিতে ভয়, রক্তাক্ত দৃশ্য, অন্ধকার হাস্যরস এবং ভিডিও গেমের মতো ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া গল্পের সমন্বয় দেখা গেছে। ছবিতে ব্রায়ানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অস্টিন আব্রামস। তার সঙ্গে আছেন জ্যাক চেরি, কালি রেইস ও পল ওয়াল্টার হাউজার।
১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির পর সিনেমাটি উদ্বোধনী সপ্তাহান্তে উত্তর আমেরিকায় আয় করেছে ৬ কোটি ডলার। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এসেছে আরও ৪ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রথম সপ্তাহে ছবিটির আয় দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বাজেটের এই ছবিটির দৈর্ঘ্য ৯০ মিনিট।
সাধারণ কুরিয়ার থেকে ভয়ংকর মিশনের শুরু
গল্পের শুরু ব্রায়ানকে ঘিরে। সে কোনো প্রশিক্ষিত যোদ্ধা নয়, নেই কোনো বিশেষ ক্ষমতাও। সে একজন সাধারণ মেডিক্যাল কুরিয়ার, যার জীবন এগোচ্ছিল স্বাভাবিকভাবেই।
প্রেমিকা মিশেলের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই ব্রায়ান জানতে পারে, মিশেল অন্তঃসত্ত্বা। ঠিক সেই সময় বাড়তি পারিশ্রমিকের একটি ডেলিভারির প্রস্তাব আসে তার কাছে। র্যাকুন সিটি জেনারেল হাসপাতালে একটি বিশেষ প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেয় সে।
কিন্তু তুষারে ঢাকা রাস্তায় সেই যাত্রাই বদলে দেয় তার জীবন। পথে দুর্ঘটনার পর ব্রায়ান এমন এক পরিস্থিতিতে পড়ে, যেখানে তাকে নিজের বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হয়। কাছের একটি খামারবাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পরই শুরু হয় তার আসল দুঃস্বপ্ন।

প্রথম ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
খামারবাড়িতে ব্রায়ানের সামনে আসে সংক্রমিত এক অস্বাভাবিক কুকুর। প্রাণীটির শরীরের পরিবর্তন দেখে সে বুঝতে পারে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। এরপর বাড়ির মালিকও ভয়ংকর এক বিকৃত সত্তায় পরিণত হয়। অস্ত্র ব্যবহারে অনভিজ্ঞ ব্রায়ান তখন বুঝতে পারে, বাস্তব জীবন কোনো ভিডিও গেম নয়। কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে তাকে সেই গেমের মতোই প্রতিটি বিপদ পার হতে হবে।
সংক্রমণ ব্রায়ানের শরীরেও
খামারবাড়ি থেকে পালানোর পর র্যাকুন সিটির দিকে এগিয়ে যায় ব্রায়ান। পথে একটি আরভিতে একটি সংক্রমিত শিশুর মুখোমুখি হয় সে। সাহায্য করতে গিয়ে শিশুটির কামড় খায় ব্রায়ান। এরপর ধীরে ধীরে তার শরীরেও ভাইরাসের প্রভাব দেখা দিতে শুরু করে। এদিকে শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভয়ংকর সংক্রমণ। ইঁদুরের মতো প্রাণীগুলোও পরিবর্তিত হয়ে এক ভয়াবহ দানবীয় রূপ নেয়।
প্যাকেটের ভেতরে কি ছিল ?
পথে ব্রায়ানকে উদ্ধার করে আমব্রেলা করপোরেশনের কর্মী কার্ল ও ম্যাক্সিন। তাদের কাছ থেকেই সে জানতে পারে, তার বহন করা প্যাকেটের ভেতরে রয়েছে এমন একটি যৌগ, যা ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যে কাজটি সে শুধু বাড়তি অর্থের জন্য নিয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে পুরো শহর এবং তার নিজের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক মিশন।

র্যাট কিংয়ের সঙ্গে ভয়ংকর লড়াই
ব্রায়ানের যাত্রার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে আসে ‘র্যাট কিং’। বিশাল আকারের এই দানবীয় প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে তাকে নর্দমা, রাস্তা এবং ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে এগোতে হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই তাকে নতুন বিপদের মুখোমুখি হতে হয়।
মিশেলের কাছে শেষ বার্তা
হাসপাতালের পার্কিং গ্যারেজে পৌঁছে ব্রায়ান প্রেমিকা মিশেলের জন্য একটি ভয়েস মেসেজ রেখে যায়। নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে সে জানায়, তার একমাত্র ইচ্ছা আবার মিশেলের কাছে ফিরে যাওয়া। ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও এই মুহূর্তটি ব্রায়ানের মানবিক দিকটিকে সামনে আনে।
২৮ তলার গবেষণাগার
আমব্রেলার বিজ্ঞানী ডেভ নিরাপত্তা ক্যামেরার মাধ্যমে ব্রায়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি তাকে হাসপাতালের ২৮ তলার গবেষণাগারে প্যাকেটটি পৌঁছে দিতে বলেন।কিন্তু সেখানে পৌঁছানো সহজ ছিল না। সিঁড়ি, লিফট, মাতৃত্ব বিভাগ এবং ভাঙা স্কাইওয়াক, প্রতিটি জায়গাতেই অপেক্ষা করছিল নতুন বিপদ।
শেষ পর্যন্ত ব্রায়ান গবেষণাগারে পৌঁছে যায় এবং বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি করতে সক্ষম হন। কিন্তু ততক্ষণে ব্রায়ানের শরীরে সংক্রমণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
প্রতিষেধক তৈরি হলেও বাঁচতে পারে না ব্রায়ান?
ভাইরাসের প্রভাবে ব্রায়ান নিজেই এক ভয়ংকর প্রাণীতে পরিণত হতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা তাকে প্রতিষেধক দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেষ মুহূর্তে প্রতিষেধকের সিরিঞ্জ ভবন থেকে নিচে পড়ে যায়। ফলে প্রতিষেধক তৈরি হলেও সেটি ব্রায়ানের শরীরে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না।
সিনেমায় তার মৃত্যু সরাসরি দেখানো হয়নি। তাই ব্রায়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
গেমের মতো অভিজ্ঞতা, কিন্তু নতুন গল্প
নতুন ‘রেসিডেন্ট ইভিল’ এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো এর গল্পের ধরন। পরিচিত গেম চরিত্রের বদলে এবার একজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে ভয়াবহ এই পৃথিবী দেখানো হয়েছে।
সীমিত অস্ত্র, নতুন নতুন জায়গায় পৌঁছানো, প্রতিটি ধাপে নতুন শত্রুর মুখোমুখি হওয়া, সব মিলিয়ে ছবিতে ভিডিও গেমের অনুভূতি ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ভয়াবহ দৃশ্যের পাশাপাশি ছবিতে রয়েছে অন্ধকার হাস্যরসও। ব্রায়ানের সাধারণ মানুষের মতো প্রতিক্রিয়া এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
নতুন এই সিনেমা শুধু দানব আর ভাইরাসের গল্প নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ বেঁচে থাকার লড়াই। একটি সাধারণ ডেলিভারি থেকে শুরু হওয়া ব্রায়ানের যাত্রা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় জীবন-মৃত্যুর পরীক্ষায়। ভয়, অ্যাকশন, হাস্যরস এবং ভিডিও গেমের আবহ , সব মিলিয়ে নতুন ‘রেসিডেন্ট ইভিল’ পুরোনো ভক্তদের পাশাপাশি নতুন দর্শকদেরও আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছে।









