২০২০ সালের জুন মাস । মুম্বাইয়ের একটি বহুতল ভবন থেকে পড়ে মৃত্যু হয় বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের ম্যানেজার দিশা সালিয়ানের। পুলিশ প্রথমে ঘটনাটিকে অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে। পরে তদন্তে এটিকে আত্মহত্যা বলে জানানো হয়।
কিন্তু ছয় বছর পর সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই উঠেছে বড় প্রশ্ন। দিশার বাবার আবেদনের পর মুম্বাই হাইকোর্ট নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। এখন মামলাটি তদন্ত করছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)।
যে কারণে প্রশ্ন উঠল
দিশার বাবা সতীশ সালিয়ান শুরু থেকেই মেয়ের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। তার দাবি, দিশাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল এবং প্রভাবশালী কয়েকজনকে বাঁচাতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানো হয়। তবে এগুলো এখনো অভিযোগ ও তদন্তের বিষয়, প্রমাণিত সত্য নয়।
২ সেপ্টেম্বর মুম্বাই হাইকোর্ট আগের তদন্তের বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালত জানায়, প্রায় ছয় বছর ধরে দুই ধাপে চলা তদন্তে অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
আদালতের নজরে আসে ঘটনাস্থলের তদন্তে দেরি, সিসিটিভি নিয়ে অসংগতি এবং ময়নাতদন্তের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন। ভবনের ওপরের তলা থেকে পড়ে মৃত্যু হলেও শরীরে আঘাতের ধরন নিয়েও আদালত প্রশ্ন তোলে। ঘটনাস্থলে রক্তের চিহ্ন না পাওয়ার বিষয়টিও আদালতের পর্যবেক্ষণে আসে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন ছিল, পরিবারের পক্ষ থেকে সন্দেহ প্রকাশের পরও কেন কোনো এফআইআর করা হয়নি। পুলিশ এতদিন শুধু অস্বাভাবিক মৃত্যুর রিপোর্টের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়েছে।

সিবিআই কেন আবার মাঠে
হাইকোর্ট গত ২ সেপ্টেম্বর সিবিআইকে এফআইআর করে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেয়, এফআইআরে কারও নাম থাকলেই তিনি অভিযুক্ত হয়ে যান না। তদন্তে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলেই কেবল কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা যাবে।
এরপর সতীশ সালিয়ানের অভিযোগের ভিত্তিতে সিবিআই এফআইআর করে। এতে হত্যা, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ষড়যন্ত্র এবং আলামত নষ্ট বা বদলে দেওয়ার মতো অভিযোগ তদন্তের আওতায় এসেছে। এতে কয়েকজন রাজনীতিক, অভিনেতা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সুশান্তের সঙ্গে যোগসূত্র কোথায়?
দিশা অল্প সময়ের জন্য অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছিলেন। ৮ জুন দিশার মৃত্যুর মাত্র ছয় দিন পর, ১৪ জুন সুশান্তকেও মুম্বাইয়ের বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
দিশার বাবা দাবি করেছেন, তার মেয়ে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বেআইনি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন এবং সেই তথ্য সুশান্তকে জানিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, পরে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় দুজনকেই নীরব করার ষড়যন্ত্র করা হয়। তবে এই দাবির পক্ষে এখনো আদালত বা তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত কোনো প্রমাণ নেই।
সুশান্তের মৃত্যুও প্রথমে আত্মহত্যা হিসেবে তদন্ত করা হয়। পরে সিবিআই তদন্ত করে এবং গত বছর মামলাটি বন্ধ করে দেয়। সংস্থাটি জানায়, সুশান্ত আত্মহত্যা করেই মারা গেছেন এবং রিয়া চক্রবর্তী বা তার পরিবারের বিরুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ছয় বছর পরও রয়ে গেছে প্রশ্ন
দিশা সালিয়ানের মৃত্যুর ছয় বছর পর আবারও খুলেছে পুরোনো তদন্তের ফাইল। এবার নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে সেই রাতের ঘটনা, আগের তদন্তের নথি, ময়নাতদন্তের তথ্য এবং দিশার বাবার করা গুরুতর অভিযোগ।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে সত্য বা প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এফআইআরে কারও নাম থাকা মানেই তিনি অপরাধী, এমনটিও নয়। নতুন তদন্তের ফলই বলবে, দিশার মৃত্যু সত্যিই আত্মহত্যা ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা ছিল।
ছয় বছর ধরে মেয়ের মৃত্যুর সত্য জানতে অপেক্ষা করছেন বাবা সতীশ সালিয়ান। আদালতের নতুন নির্দেশের পর তিনি বলেছেন, এতে তিনি কিছুটা শান্তি পেয়েছেন। তার একমাত্র চাওয়া, মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত সত্য সামনে আসুক এবং দায়ী কেউ থাকলে তার বিচার হোক।
এখন সেই উত্তর খুঁজতেই আবার শুরু হয়েছে তদন্ত। দিশার মৃত্যুর সঙ্গে সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, নাকি দুটি ঘটনা আলাদা? সেটিও নতুন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ছয় বছর পর এই তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোন সত্য সামনে আনে, সেদিকেই এখন নজর।









