রহস্যময় বন, জাদুকরী প্রাণী, হারিয়ে যাওয়া ভাইকে উদ্ধারের অভিযান, সব মিলিয়ে লায়কার নতুন স্টপ-মোশন অ্যানিমেশন সিনেমা ওয়াইল্ডউড নিয়ে এসেছে পরিচিত রূপকথার আবহ। গল্পে নতুনত্বের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও অসাধারণ নির্মাণশৈলী, আবেগঘন মুহূর্ত এবং সূক্ষ্ম অ্যানিমেশন কাজ সিনেমাটিকে আলাদা করে তুলেছে।
‘কোরালাইন’, ‘প্যারানরম্যান’ এবং ‘কুবো অ্যান্ড দ্য টু স্ট্রিংস’-এর মতো জনপ্রিয় স্টপ-মোশন চলচ্চিত্রের জন্য পরিচিত পোর্টল্যান্ডভিত্তিক অ্যানিমেশন স্টুডিও লায়কা এবার দর্শকদের নিয়ে গেছে এক রহস্যময় বনের জগতে।
পরিচালনা করেছেন ট্রাভিস নাইট। ১৩০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন পেটন এলিজাবেথ লি, জ্যাকব ট্রেম্বলে, ক্যারি মুলিগান, মাহেরশালা আলী এবং অ্যাঞ্জেলা বাসেট। সিনেমাটি তৈরি হয়েছে ইন্ডি রক ব্যান্ড দ্য ডিসেম্বারিস্টস-এর প্রধান গায়ক কলিন মেলয়ের শিশুতোষ উপন্যাস অবলম্বনে।
‘ওয়াইল্ডউড’এর গল্প – ভাইকে খুঁজতে অজানা বনে প্রু
সিনেমার মূল চরিত্র ১২ বছর বয়সী প্রু। ছোট ভাই ম্যাককে দেখাশোনার দায়িত্ব তার ওপর। পরিবারের কঠোর নির্দেশ ছিল, ম্যাককে কখনো বাড়ির বাইরে নেওয়া যাবে না। কিন্তু একদিন সেই নিয়ম ভেঙে ম্যাককে নিয়ে বাইরে যায় প্রু। আর তখনই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। বিশাল একদল কাক এসে ম্যাককে তুলে নিয়ে যায় এবং তাকে নিয়ে যায় শহরের বাইরে এক রহস্যময় জগতে।

ভাইকে উদ্ধারের জন্য প্রু সাইকেলে করে কাকগুলোর পিছু নেয়। তার সঙ্গে যোগ দেয় সহপাঠী কার্টিস। শুরু হয় তাদের বিপজ্জনক যাত্রা, যা শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় ওয়াইল্ডউড নামের এক জাদুকরী বনে। এই বনে রয়েছে অদ্ভুত সব প্রাণী, বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং ক্ষমতার লড়াই। ম্যাককে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে প্রুকে শুধু শত্রুর মুখোমুখি হতে হয় না, বরং বিভক্ত এই জগতকে এক করার দায়িত্বও নিতে হয়।
অ্যানিমেশনে লায়কার নতুন চমক
‘ওয়াইল্ডউড’ এর সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভিজ্যুয়াল নির্মাণ। লায়কা বরাবরই স্টপ-মোশন অ্যানিমেশনে সূক্ষ্ম কাজের জন্য পরিচিত, আর এই সিনেমাতেও সেই দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। চরিত্রের ছোট ছোট অভিব্যক্তি, সেট ডিজাইন, আলো-ছায়ার ব্যবহার এবং বিশাল বনভূমির নির্মাণে রয়েছে নির্মাতাদের দীর্ঘ পরিশ্রমের ছাপ।
সিনেমার শুরুতে পোর্টল্যান্ড শহরকে খুব পরিচিত পরিবেশে দেখানো হয়েছে। প্রুর কৈশোরের স্বাধীনতা, সাইকেলে ছুটে চলা এবং শহরের ব্যস্ততা বাস্তব অনুভূতি তৈরি করে। পরে সেই পরিচিত শহরই বদলে যায় এক রহস্যময় বনে। পোর্টল্যান্ডের বিভিন্ন স্থাপনা নতুন রূপে হাজির হয় ওয়াইল্ডউডের জগতে। বাস্তব জায়গার সঙ্গে কল্পনার এই মিশ্রণ সিনেমাটির অন্যতম আকর্ষণ।
শোক থেকে তৈরি এক ভয়ংকর চরিত্র
সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ডাওয়াজার গভর্নেস। কণ্ঠ দিয়েছেন ক্যারি মুলিগান। একসময় তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় শাসক। কিন্তু সন্তানের মৃত্যুর পর তার জীবন বদলে যায়। শোক ধীরে ধীরে তাকে অন্ধকার পথে নিয়ে যায়। নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করতে তিনি কালো জাদুর আশ্রয় নেন এবং কোয়োটদের ব্যবহার করেন।
অন্যদিকে, প্রু নিজের সাহস ও নেতৃত্বের মাধ্যমে ওয়াইল্ডউডের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করার চেষ্টা করে। পাখিদের অ্যাভিয়ান প্রিন্সিপ্যালিটি, সাউথ উডের প্রাণী এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্ব সিনেমার গল্পকে এগিয়ে নেয়।
‘ওয়াইল্ডউড’ এর গল্পে নতুন কিছু উপাদান থাকলেও এর মধ্যে পরিচিত রূপকথার প্রভাব স্পষ্ট। ‘দ্য ক্রনিকলস অব নার্নিয়া’ কিংবা লায়কার আগের সিনেমা ‘কোরালাইন’-এর মতো কিছু মিল দর্শকের চোখে পড়তে পারে। তবে সিনেমাটির আসল শক্তি গল্পের নতুনত্বে নয়, বরং চরিত্র নির্মাণ এবং আবেগ প্রকাশে। ছোট ছোট মুহূর্তগুলো সিনেমাটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে। ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেও দুই শিশুর একে অপরের ওপর নির্ভরতা, বন্ধুত্ব এবং সাহসের প্রকাশ গল্পে আলাদা গভীরতা যোগ করেছে।

সিনেমাটির দৈর্ঘ্য ১৩০ মিনিট। যুক্তরাষ্ট্রে এটি PG-13 রেটিং পেয়েছে। অর্থাৎ, ১৩ বছরের কম বয়সী দর্শকদের জন্য অভিভাবকের সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ কিছু দৃশ্য এবং অ্যাকশন অংশ ছোট দর্শকদের জন্য কিছুটা ভয়ংকর মনে হতে পারে। তবে কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় অ্যানিমেশন অভিজ্ঞতা হতে পারে।
স্টপ-মোশন অ্যানিমেশনের ক্ষেত্রে লায়কার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। ‘ওয়াইল্ডউড’-এ সেই ঐতিহ্য আরও বড় পরিসরে দেখা গেছে। গল্প পুরোপুরি নতুন না হলেও নির্মাণের মান, ভিজ্যুয়াল সৌন্দর্য এবং আবেগের কারণে সিনেমাটি অ্যানিমেশন বিভাগের পুরস্কারের আলোচনায় থাকতে পারে। যারা স্টপ-মোশন অ্যানিমেশন, ফ্যান্টাসি গল্প এবং আবেগঘন অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন, তাদের জন্য ‘ওয়াইল্ডউড’ হতে পারে ২০২৬ সালের উল্লেখযোগ্য অ্যানিমেশন সিনেমাগুলোর একটি।
‘ওয়াইল্ডউড’ সিনেমার তথ্য
- সিনেমার নাম: Wildwood
- পরিচালক: ট্রাভিস নাইট
- প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান: লায়কা এন্টারটেইনমেন্ট
- দৈর্ঘ্য: ১৩০ মিনিট









