Home সর্বশেষ শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
শাহ আবদুল করিম, ছবি: সংগৃহীত

শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হলেও তাঁর সৃষ্টি থেমে নেই। প্রেম-বিরহ থেকে মানুষের জীবনের টানাপোড়েন, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিভিন্ন অনুভূতিতে আজও বেজে ওঠে তাঁর গান। মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও গানের পঙ্‌ক্তি প্রকাশ করে তাঁকে স্মরণ করছেন অনুরাগীরা। দেশের বিভিন্ন স্থানেও আয়োজন করা হয়েছে স্মরণসভা ও গানের অনুষ্ঠান।

শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে বিশেষভাবে প্রদর্শিত হবে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ভাটির পুরুষ’। শাকুর মজিদের নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্রটি শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এলিফ্যান্ট রোডে দৃশ্য কারখানার কার্যালয়ে প্রদর্শিত হবে।

প্রদর্শনী শেষে নির্মাতা শাকুর মজিদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বও থাকবে। এর মধ্য দিয়ে আবারও দর্শকের সামনে উঠে আসবে ভাটির এই কিংবদন্তি সাধকের জীবন, দর্শন ও দীর্ঘ সংগীতযাত্রা।

শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

শেষ দিনগুলো কেটেছিল হাসপাতালে

জীবনের শেষ অধ্যায়টা সহজ ছিল না শাহ আবদুল করিমের। ২০০৯ সালের আগস্ট থেকেই বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। ৩ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের বাড়িতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা ও অক্সিজেন দেওয়ার পর সিলেটের নূরজাহান জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে।

টানা চার দিন চিকিৎসার পর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল। তবে তখন তাঁর স্মৃতিশক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। একমাত্র ছেলে শাহ নূরজালালসহ অল্প কয়েকজনকে ছাড়া পরিচিত অনেককেই ঠিকভাবে চিনতে পারতেন না। কথাবার্তাও হয়ে উঠেছিল অস্পষ্ট।

গান শুনেই কখনো হাসি, কখনো চোখে পানি

শেষ দিনগুলোতেও গান থেকে দূরে ছিলেন না শাহ আবদুল করিম। ৯ সেপ্টেম্বর কিছুটা খাওয়াদাওয়া করার পাশাপাশি ধীরে ধীরে কথাও বলছিলেন। একপর্যায়ে গান শুনতে চান তিনি।

তখন শিষ্য বশিরউদ্দিন সরকার নিজের লেখা একটি গান শোনান। ‘কী খেলা খেলতেছেন বাবা করিম শায়/ গাড়ি চলে না চলে না বলে চালাচ্ছেন মৌলায়’ গানটি শুনে হেসেছিলেন করিম।

এরপর বশিরউদ্দিন গেয়ে শোনান তাঁর ওস্তাদের লেখা ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইল’। এবার দৃশ্যটা বদলে যায়। শাহ আবদুল করিমের চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। উপস্থিত কয়েকজন এমন গান শোনানোর জন্য বশিরউদ্দিনকে দোষ দিলেও করিম ইশারায় তাঁদের থামিয়ে দেন।

শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

শিষ্যকে দিয়েছিলেন অদৃশ্য আশীর্বাদ

১৯৮৫ সালে শাহ আবদুল করিমের শিষ্যত্ব নেওয়া বশিরউদ্দিন সরকার পরে সেই দিনের স্মৃতি জানিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হাসি-কান্নার পর করিম অনেকটা নির্লিপ্ত হয়ে পড়েন। কথা না বলে ইশারায় কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন।

একপর্যায়ে হাত মুঠো করে প্রতীকী কিছু বশিরউদ্দিনের হাতে দিয়ে বলেন, ‘তোমার ঠেখন নাই।’ অর্থাৎ তুমি কোথাও আটকে থাকবে না। শিষ্যও সেই অদৃশ্য আশীর্বাদ গ্রহণ করে পকেটে রাখার ভঙ্গি করেছিলেন।

আরেক শিষ্য বাউলশিল্পী আবদুর রহমান ১৯৭৭ সালে শাহ আবদুল করিমের শিষ্যত্ব নেন। করিম তাঁকে আদর করে ডাকতেন ‘রহমান সাধু’ নামে।

হাসপাতালে ওস্তাদের শেষ দিনগুলোর কথা স্মরণ করে আবদুর রহমান জানিয়েছিলেন, করিম কথা বলতে চাইতেন। কিন্তু কণ্ঠ এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে তাঁর কথা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরিচিতদের কাছে ডেকে ইশারায় বলতেন, ‘কই বেটাইন, তোমরা কই? মানুষ আনো, গফ করি। আর দরজাটা লাগাও।’

স্বল্পাহারী শাহ আবদুল করিম হাসপাতালে যাওয়ার পর প্রায় খাওয়াদাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিলেন। অল্প পরিমাণে মান্ডাড়ি-চাল পিষে তৈরি তরল খাবার ও ফলের রস খেতেন। শোল মাছ ও রসগোল্লা ছিল তাঁর পছন্দের খাবার। শেষ সময়ে সেগুলোর কথাও ইশারায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

৯৩ বছরে থেমেছিল ভাটির গানের কণ্ঠ

১১ সেপ্টেম্বর সকালে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। ঘন ঘন শ্বাস নিতে শুরু করেন তিনি। ছেলে শাহ নূরজালাল চিকিৎসক ডাকতে কক্ষের বাইরে গেলে আবদুর রহমানকে কাছে ডাকেন করিম।

শিষ্য তাঁকে জড়িয়ে ধরলে অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে হাত তুলে শিষ্যের মুখে বুলিয়ে দেন। আবদুর রহমানের ধারণা, সেই মুহূর্তে ওস্তাদ তাঁকে বলেছিলেন, ‘যাও, মানুষে তোমারে মায়া করবনে।’

পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার আগে তাঁর অবস্থার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই সময় আর আসেনি।

হাসপাতালে ১০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে ৯৩ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন শাহ আবদুল করিম।

শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

কান্না আর গানে শেষ বিদায়

শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালের সামনে ভিড় করেন অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ আবার প্রিয় শিল্পীর গান গেয়ে তাঁকে বিদায় জানান।

পরে মরদেহ নেওয়া হয় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে বাউলশিল্পীরা তাঁর গান গেয়ে শোকগাথা নিবেদন করেন। সিলেট ও দিরাইয়ে জানাজা শেষে কালনী নদী পেরিয়ে মরদেহ নেওয়া হয় উজানধল গ্রামে। ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে স্ত্রী সরলার কবরের পাশে সমাহিত করা হয় তাঁকে।

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে জন্ম শাহ আবদুল করিমের। দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ হয়নি। শৈশবে গরু চরানোর পাশাপাশি মুদিদোকানেও কাজ করেছেন। তবে কৈশোর পেরোনোর আগেই হাওরাঞ্চলে শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন।

পরবর্তী প্রায় সাত দশক কেচ্ছা, মালজোড়া, বাউল ও গণসংগীতকে নিজের সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। তাঁর লেখা গানের সংখ্যা প্রায় ৫০০। ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘বসন্ত বাতাসে’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইল’, ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে’সহ বহু গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

শুধু প্রেম বা বিরহ নয়, শাহ আবদুল করিমের গানে উঠে এসেছে সময় ও সমাজের নানা বাস্তবতা। দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ে তাঁর গান মানুষের মধ্যে জাগরণ তৈরি করেছে।

সাধনার পথের শিল্পী হয়েও তাঁর সৃষ্টিতে ছিল অসাম্প্রদায়িকতার বোধ, মুক্তচিন্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here