লানা ডেল রে’র যাত্রা
পপ সংগীতের জগতে অনেক শিল্পী আছেন, যাদের গান জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু খুব কম শিল্পীই আছেন, যাদের পুরো শিল্পীসত্তা যেন একটি চলচ্চিত্রের মতো নির্মিত। লানা ডেল রে সেই বিরল ব্যতিক্রমদের একজন। তার গান শুনলে যেমন মনে হয় কোনো গল্পের ভেতর প্রবেশ করা হচ্ছে, তেমনি তার ভিডিও, মঞ্চ উপস্থাপনা এবং গানের চরিত্রগুলোও যেন বড় পর্দা থেকে উঠে আসা দৃশ্য।
২০১২ সালে ‘ভিডিও গেমস’ (Video Games) প্রকাশের পর বিশ্বসংগীতের অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন লানা ডেল রে। তবে শ্রোতাদের আকৃষ্ট করেছিল শুধু গানটির সুর বা আবেগঘন কথামালা নয়, এর ব্যতিক্রমী ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনাও।
গানটির ভিডিওতে ব্যক্তিগত ওয়েবক্যাম ফুটেজ, পুরোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য এবং আর্কাইভ ভিডিও একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই সময়ের প্রচলিত মিউজিক ভিডিওর ধারা থেকে এটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিষণ্নতা, স্মৃতি এবং মধুর বেদনার অনুভূতিকে ফুটিয়ে তুলতে চলমান ছবির এমন ব্যবহার দ্রুতই লানা ডেল রেকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
সিনেমার প্রতি ভালোবাসার ছাপ
লানা ডেল রের শিল্পীসত্তার সঙ্গে সিনেমার সম্পর্ক বহু পুরোনো। তার মঞ্চনামও সেই ভালোবাসারই প্রতিফলন। নিজের নামের প্রথম অংশ তিনি নিয়েছিলেন হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী লানা টার্নার (Lana Turner) এর নাম থেকে।
তার গান, ভিডিও এবং নান্দনিক উপস্থাপনায় বারবার ফিরে এসেছে পুরোনো হলিউড, খ্যাতির উজ্জ্বল ও অন্ধকার দিক এবং আমেরিকান জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ। ফলে শুরু থেকেই তার কাজকে অনেকেই ‘সিনেমাটিক পপ’ এর একটি স্বতন্ত্র রূপ হিসেবে দেখেছেন।
‘বর্ন টু ডাই’ এর (Born to Die) জগৎ
লানা ডেল রের প্রথম বড় লেবেল অ্যালবাম ‘বর্ন টু ডাই’ (Born to Die) ছিল তার শিল্পীসত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশগুলোর একটি।

অর্কেস্ট্রাল সুর, পপ সংগীতের প্রভাব এবং নাটকীয় আবহের সমন্বয়ে তিনি এমন এক শব্দজগৎ তৈরি করেন, যেখানে প্রতিটি গান যেন আলাদা গল্প বলে। গ্ল্যামার, আসক্তি, প্রেম এবং আত্মনিবেদনের জটিল অনুভূতিগুলো তার গানে চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো ফুটে ওঠে।
‘কারমেন’ (Carmen) গানটিতে দ্রুত খ্যাতি অর্জনের পর পতনের দিকে এগিয়ে যাওয়া এক তরুণ তারকার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। অন্যদিকে ‘অফ টু দ্য রেসেস’ (Off to the Races) বিলাসিতা ও অতিরিক্ত ভোগবাদের এক বর্ণাঢ্য চিত্র তুলে ধরে। সেখানে ‘লোলিতা’ (Lolita) এবং ‘বনি অ্যান্ড ক্লাইড’ (Bonnie and Clyde) এর মতো সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের প্রভাবও স্পষ্ট।



চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রেরণা
ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে লানা ডেল রে বহু চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো তার শিল্পীসত্তাকে প্রভাবিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ইজি রাইডার’ (Easy Rider), ‘ব্লু ভেলভেট’ (Blue Velvet) এবং ‘কার্নিভাল অব সোলস’ (Carnival of Souls)। এমনকি ‘লাস্ট ফর লাইফ’ (Lust for Life) অ্যালবাম যুগে তাকে হলিউড সাইনের ওপর নাচতেও দেখা যায়, যা তার শিল্পীসত্তার সঙ্গে চলচ্চিত্রের গভীর সংযোগকে আরও স্পষ্ট করে।
বড় পর্দার পথে যাত্রা
লানা ডেল রের সংগীতে সিনেমার প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে চলচ্চিত্রের জন্য গান রেকর্ড করার প্রস্তাব পাওয়া তার জন্য খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না।
২০১৩ সালে তিনি ‘ট্রপিকো’ (Tropico) নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রকাশ করেন। এতে অ্যালেন গিন্সবার্গ (Allen Ginsberg) এর কবিতার উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয় এবং মেরিলিন মনরো (Marilyn Monroe) ও এলভিস প্রেসলি (Elvis Presley) এর মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে ‘গার্ডেন অব ইডেন’ এর একটি নতুন ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়।

‘ইয়ং অ্যান্ড বিউটিফুল’ এর (Young and Beautiful) সাফল্য
একই বছরে লানা ডেল রে রেকর্ড করেন ‘ইয়ং অ্যান্ড বিউটিফুল’ (Young and Beautiful), যা বাজ লুহরম্যান (Baz Luhrmann) পরিচালিত ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’ (The Great Gatsby) চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাকে ব্যবহৃত হয়।

গানটি একাধিক গ্র্যামি মনোনয়ন অর্জন করে এবং আজও এটি তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর একটি। অনেকের মতে, বড় পর্দার আবেগ ও আভিজাত্যকে ধারণ করার জন্য গানটি ছিল একেবারে উপযুক্ত।
সাউন্ডট্র্যাকের নির্ভরযোগ্য নাম
‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’র পর চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়মিত কাজ করতে দেখা যায় লানা ডেল রেকে।
‘বিগ আইস’ (Big Eyes), ‘দ্য এজ অব অ্যাডালাইন’ (The Age of Adaline), ‘ম্যালিফিসেন্ট’ (Maleficent), ‘ইউফোরিয়া’ (Euphoria), ‘চার্লিজ অ্যাঞ্জেলস’ (Charlie’s Angels), ‘দ্য নিউ লুক’ (The New Look) এবং ‘স্ক্যারি স্টোরিজ টু টেল ইন দ্য ডার্ক’ (Scary Stories to Tell in the Dark) এর মতো প্রকল্পে তার অবদান রয়েছে।
ফলে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতে মৌলিক এবং আবেগনির্ভর সাউন্ডট্র্যাক গানের জন্য তিনি একটি নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে উঠেছেন।
নিজের শিল্পীসত্তার প্রতি অটুট
লানা ডেল রের মতে, অন্য কোনো প্রকল্পের জন্য কাজ করলেও তিনি কখনো নিজের শিল্পীসত্তা থেকে সরে যান না। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,
আমি যখন কোনো চলচ্চিত্রের জন্য লিখি বা অন্য কারও প্রকল্পে কাজ করি, তখনও আমি আমার নিজস্ব নান্দনিকতার প্রতি সত্য থাকি। সেটি হয়তো জ্যাজের শিকড়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিংবা আরও বেশি সিনেমাটিক এক সুরের ভেতর।
সম্ভবত এ কারণেই তার গানগুলো একই সঙ্গে ব্যক্তিগত, আবেগঘন এবং চলচ্চিত্র উপযোগী হয়ে ওঠে।
সংগীত ও সিনেমার মাঝখানে নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছেন লানা ডেল রে। তার কাজের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়, চলচ্চিত্রের গল্প এবং সংগীতের আবেগকে একসঙ্গে বুনে দেওয়ার বিরল ক্ষমতা রয়েছে তার।
তাই ভক্তদের অনেকেরই আশা, ভবিষ্যতে হয়তো তারা লানা ডেল রের সম্পূর্ণ একটি চলচ্চিত্র সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবাম শুনতে পাবেন। তার শিল্পীজীবনের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিলে, সেই প্রত্যাশাকে অমূলক বলার সুযোগ নেই।


