লানা ডেল রে’র যাত্রা
২০১২ সালে ভাইরাল গান ভিডিও গেমস–এর মাধ্যমে যখন লানা ডেল রে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিলেন, তখন শুধু তার সমৃদ্ধ ও সিনেমাটিক ব্যালাডই শ্রোতাদের মুগ্ধ করেনি। গানটির ভিডিও ও ছিল সে সময়ের টেলিভিশন সংগীতচর্চায় একেবারেই ব্যতিক্রমী। সেখানে গায়িকার ওয়েবক্যাম ফুটেজের সঙ্গে সিনেমার দৃশ্য এবং পুরোনো আর্কাইভ ভিডিও মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এক অনন্য ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা।
হোক তা টলোমলো এক তারকার পাপারাজ্জি ছবি কিংবা রোদেলা বিকেলে সাইকেল চালানো কিশোর-কিশোরীদের ভিনটেজ দৃশ্য—বিষণ্নতা ও মধুর বেদনার অনুভূতিকে ফুটিয়ে তুলতে চলমান ছবির এমন সযত্ন ব্যবহারই ডেল রের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। তার মঞ্চনামও চলচ্চিত্রজগতের প্রতি ভালোবাসার সাক্ষ্য বহন করে; তিনি নিজের নামের প্রথম অংশ নিয়েছেন কিংবদন্তি হলিউড তারকা লানা টার্নার–এর নাম থেকে।
ফলে তার প্রথম বড় লেবেল অ্যালবাম বর্ন টু ডাই সংগীত ও গীতিকথা—উভয় দিক থেকেই ছিল সিনেমাটিক আবহে মোড়ানো। অর্কেস্ট্রাল সুর ও পপ প্রভাবের মিশেলে তিনি তৈরি করেন এক স্বতন্ত্র বারোক ধাঁচের শব্দজগৎ, যেখানে প্রতিটি গান যেন গ্ল্যামার, আসক্তি ও নিবেদনের অন্ধকার দিক নিয়ে নির্মিত ছোট্ট একটি চলচ্চিত্র।
কারমেন গানটিতে যেন দ্রুত উত্থানের পর পতনের পথে হাঁটা এক তারকার গল্প দেখা যায়। অন্যদিকে অফ টু দ্যা রেসেস (Off to the Races)–এ বিলাসিতা ও অতিরিক্ত ভোগের এক আড়ম্বরপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে, যেখানে লোলিতা, বনি এবং ক্লাইড এর মতো সাহিত্য ও চলচ্চিত্রকর্মের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে ডেল রে অসংখ্য চলচ্চিত্রের উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইজি রাইডার, ব্লু ভেলভেট এবং কার্নিভ্যাল অফ সোলস। এমনকি লাস্ট ফর লাইফ যুগে তাকে হলিউড সাইনের ওপর নাচতেও দেখা গেছে।
তাই খ্যাতির শুরুর দিকেই কোনো চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাকের জন্য গান রেকর্ড করার প্রস্তাব পাওয়া তার জন্য স্বাভাবিক ছিল। ২০১৩ সালটি ছিল তার জন্য বিশেষভাবে সিনেমাময়। একদিকে তিনি ট্রপিকো নামের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রকাশ করেন, যেখানে অ্যালেন গিন্সবার্গ–এর কবিতার উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয় এবং মেরিলিন মনরো ও এলভিস প্রেসলি–এর মতো ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে ‘গার্ডেন অব ইডেন’-এর পুনর্নির্মাণ করা হয়।
অন্যদিকে তিনি রেকর্ড করেন ইয়ং অ্যান্ড বিউটিফুল যা ব্যবহৃত হয় বাজ লুহরম্যান পরিচালিত দ্যা গ্রেট গ্যাটসবি–এর সাউন্ডট্র্যাকে। গানটি একাধিক গ্র্যামি মনোনয়নও অর্জন করে। আজও এটি ডেল রের কনসার্টের অন্যতম জনপ্রিয় গান এবং বড় পর্দার জন্য যেন একেবারে উপযুক্ত সৃষ্টি।
এরপর থেকে তিনি বিগ আইস, দ্যা এজ অফ আদালিন, ম্যালিফিসেন্ট, ইউরোপিয়া, চার্লির অ্যাঞ্জেলস, দ্যা নিউ লুক, স্কারি স্টোরিজ টু টেল ইন দ্যা ডার্ক এবং সাম্প্রতিক ০০৭ ফার্স্ট লাইটসহ নানা প্রকল্পের সাউন্ডট্র্যাকে অবদান রেখেছেন। ফলে মৌলিক ও নির্ভরযোগ্য গান তৈরির জন্য তিনি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের অন্যতম পছন্দের শিল্পীতে পরিণত হয়েছেন।
ডেল রের স্বতন্ত্র সংগীতশৈলী ও কালজয়ী কণ্ঠের কারণে তাকে এত ঘন ঘন চলচ্চিত্রের জন্য গান লিখতে বা গাইতে বলা হয়—এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তার বিশ্বাস, গীতিকবিতার গল্পগুলোকে সিনেমাটিক নান্দনিকতায় উপস্থাপন করার প্রবণতাই তাকে চমৎকার সাউন্ডট্র্যাক গান লিখতে সাহায্য করেছে।
তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি যখন কোনো চলচ্চিত্রের জন্য লিখি বা অন্য কারও প্রকল্পে কাজ করি, তখনও আমি আমার নিজস্ব নান্দনিকতার প্রতি সত্য থাকি। সেটি হয়তো জ্যাজের শিকড়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিংবা আরও বেশি সিনেমাটিক এক সুরের ভেতর।”
আশা করা যায়, ভবিষ্যতে ভক্তরা ডেল রের সম্পূর্ণ একটি চলচ্চিত্র সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবামও পাবেন।