আজ ২ নভেম্বর, রবীন্দ্রসংগীতের কালজয়ী শিল্পী কলিম শরাফীর ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১০ সালের এই দিনে ৮৬ বছর বয়সে ঢাকায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী।
১৯২৪ সালের ৮ মে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার খয়রাডিহি গ্রামে জন্ম কলিম শরাফীর, পূর্ণ নাম মাখদুমজাদা শাহ সৈয়দ কলিম আহমেদ শরাফী। পির পরিবারে জন্ম নেওয়ায় বাড়িতে গানবাজনার চর্চা ছিল নিষিদ্ধ। তবু বাবার গান শুনে ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ঝোঁক জন্মে তাঁর।

কলকাতার বিখ্যাত সংগীত বিদ্যালয় ‘দক্ষিণী’ থেকে ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সংগীতের শিক্ষা নেন কলিম শরাফী। রবীন্দ্রসংগীতে নিজস্ব ঢং যোগ করে তিনি হয়ে ওঠেন এই ধারার অন্যতম প্রধান কণ্ঠ। পাশাপাশি গণসংগীত ও দেশাত্মবোধক গানেও ছিল তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা।
শুধু শিল্পী নন, সংগ্রামী কলিম শরাফী
মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাগারে যান কলিম শরাফী, এক বছরের বেশি সময় কাটে জেলে। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাটকে নারীদের অংশগ্রহণের পথও সহজ করেন তিনি। কমিউনিস্ট আদর্শের কারণে একসময় বাংলাদেশ বেতারে নিষিদ্ধ ছিলেন এই শিল্পী।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নানা অনুষ্ঠানে গান গেয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন জোগাড় করেন কলিম শরাফী। বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাকালীন অনুষ্ঠান পরিচালকদের একজন তিনি, দায়িত্ব পালন করেন ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি।
১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘সংগীত ভবন’, আমৃত্যু ছিলেন এর অধ্যক্ষ। বাংলাদেশ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন কলিম শরাফী। নাট্যদল ‘বহুরূপী’ ও ‘প্রান্তিক’ গড়ার পাশাপাশি জহির রায়হানের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেন ‘সোনার কাজল’ চলচ্চিত্র। তাঁর রেকর্ড করা অ্যালবামের সংখ্যা ১৮টি।
পাকিস্তান গ্রামোফোন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক হিসেবে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন কলিম শরাফী। পরে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনেও কাজ করেন তিনি। তবে চাকরির বাইরে তাঁর আসল জগৎ ছিল গান আর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেই।
সংগীতে অবদানের জন্য ১৯৮৫ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৯ সালে স্বাধীনতা পদক পান কলিম শরাফী। রবীন্দ্রসংগীতের প্রসার ও সংরক্ষণে অবদানের জন্য ২০১০ সালে পান প্রথম রবীন্দ্র পুরস্কার।
পারিবারিক জীবনে কলিম শরাফীর স্ত্রী নওশাবা খাতুন, তাঁদের এক ছেলে ও চার মেয়ে। গানের বাইরে লেখালেখিও করতেন তিনি। রাজনীতি, সংস্কৃতি ও রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তাঁর ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে নানা লেখায়।
২০১০ সালের ২ নভেম্বর ঢাকার বারিধারার বাসভবনে মারা যান কলিম শরাফী। মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয় তাঁকে। কণ্ঠ থেমে গেছে ১৬ বছর আগে, কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতের আসরে তাঁর গান আজও বেঁচে আছে।









