একসময় পর্দায় নিয়মিত দেখা গেলেও এখন অভিনয় থেকে পুরোপুরি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন অভিনেতা হাসান মাসুদ। নিয়েছেন অভিনয় থেকে অবসর। বর্তমানে বেছে বেছে বিজ্ঞাপনে কাজ করছেন। তবে নাটক কিংবা সিনেমায় নিয়মিত দেখা যাচ্ছে না অভিনেতা হাসান মাসুদকে। সম্প্রতি নিজের বর্তমান জীবনযাপন এবং অভিনয় থেকে দূরে থাকার কারণ জানিয়েছেন অভিনেতা হাসান মাসুদ।
হাসান মাসুদের ধর্মীয় জীবন নিয়ে বলতে গিয়ে নিজের হজ পালনের কথাও জানান তিনি। সম্প্রতি হজ পালন করেছেন এই অভিনেতা। এ কারণে মক্কা ও মদিনায় ৪১ দিন অবস্থান করেছেন। তবে তার মতে, এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি। এর শুরু আরও আগে থেকেই। বর্তমানে তিনি নিজেকে পুরোপুরি পরিবর্তিত একজন মানুষ হিসেবে দেখছেন।

পড়ার অভ্যাসেও পরিবর্তন, বিক্রি করেছেন ১২শ বই
জীবনের এই পরিবর্তনের সঙ্গে তার বই পড়ার অভ্যাসেও বড় পরিবর্তন এসেছে। একটা সময় প্রচুর বই পড়তেন হাসান মাসুদ। বই পড়ার প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। কিন্তু একপর্যায়ে সেই অভ্যাস থেকেও সরে এসেছেন। কেন বই পড়া ছেড়ে দিয়েছেন, সেই কারণও সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
অভিনেতা হাসান মাসুদ জানান, অতিরিক্ত বই পড়তে পড়তে একটা সময় তিনি যন্ত্রের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। তার ভেতরে মানুষের প্রতি স্বাভাবিক আবেগ বা অনুভূতি কাজ করত না। কোনো ঘটনা ঘটলেও সেটিকে আবেগ দিয়ে দেখার বদলে বিশ্লেষণ করতেন। ফলে নিজের মধ্যে এক ধরনের অনুভূতিহীনতা তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন তিনি।
এই অভিজ্ঞতার পর নিজের সংগ্রহে থাকা প্রায় এক হাজার ২০০ বই বিক্রি করে দেন অভিনেতা হাসান মাসুদ। নীলক্ষেতে বইগুলো বিক্রি করেছিলেন তিনি। এরপর থেকেই আর বই পড়েন না বলে জানান। তার মতে, জীবনের এই পর্যায়ে এসে তিনি অন্য ধরনের ভাবনা ও আত্মঅনুসন্ধানের দিকে মন দিয়েছেন।

সেনাবাহিনী দিয়ে কর্মজীবনের শুরু
অভিনেতা হাসান মাসুদের কর্মজীবনের শুরু অবশ্য অভিনয় দিয়ে হয়নি। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন তিনি। প্রায় সাত বছর পর ১৯৯২ সালে ক্যাপ্টেন পদে অবসর নেন। এরপর সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। ‘দ্য নিউ নেশন’ এ কাজ করার পর ১৯৯৫ সালে ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এ ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন।
বিবিসি বাংলাতেও কাজ করেছেন
পরে সাংবাদিকতা পেশায় আরও বড় পরিসরে কাজ করেন হাসান মাসুদ। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সাংবাদিকতা করতে করতেই পরবর্তী সময়ে অভিনয়ের জগতে প্রবেশ করেন। অভিনয়ে এসে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকের কাছে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন।
‘ব্যাচেলর’ দিয়ে বড়পর্দায় অভিষেক
মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’ সিনেমার মাধ্যমে ২০০৩ সালে বড়পর্দায় অভিষেক হয় অভিনেতা হাসান মাসুদের। এরপর ‘মেড ইন বাংলাদেশ’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পাশাপাশি অসংখ্য নাটকে কাজ করে নিজের অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দেন। তার স্বাভাবিক অভিনয় ও সংলাপ বলার ধরন দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
‘হাউসফুল’, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘এফডিসি’, ‘বউ’, ‘খুনসুটি’, ‘গ্র্যাজুয়েট’, ‘রঙের দুনিয়া’, ‘আমাদের সংসার’, ‘গণি সাহেবের শেষ কিছুদিন’ ও ‘বাতাসের ঘর’সহ বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করেছেন হাসান মাসুদ। এসব কাজের মাধ্যমে ছোটপর্দায়ও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি।

গানেও ছিল হাসান মাসুদের উপস্থিতি
অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীতের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন হাসান মাসুদ। ‘ব্যাচেলর’ সিনেমার জনপ্রিয় গান ‘আজকে না হয় ভালোবাসো’ তে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। ২০০৬ সালের ভালোবাসা দিবসে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গানের অ্যালবাম ‘হৃদয়ঘটিত’। ফলে সাংবাদিকতা, অভিনয় ও সংগীত তিন ক্ষেত্রেই নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন এই অভিনেতা।
জীবনের নতুন অধ্যায়ে হাসান মাসুদ
তবে দীর্ঘ কর্মজীবনের পর এখন অভিনেতা হাসান মাসুদের জীবনযাপনে এসেছে নতুন পরিবর্তন। নিয়মিত অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বেছে বেছে বিজ্ঞাপনে কাজ করছেন। পাশাপাশি ধর্মীয় ভাবনা ও আত্মঅনুসন্ধানে সময় দিচ্ছেন। হজ পালন এবং নিজের জীবন সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবার মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
হাসান মাসুদ বর্তমানে ধর্মীয় জীবনকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অভিনয়ের জগতে নিয়মিত না থাকলেও দর্শকের কাছে তার আগের কাজগুলোর জনপ্রিয়তা রয়েছে। আর নিজের জীবনের এই নতুন অধ্যায়ে তিনি ব্যস্ত আছেন ধর্মকর্মে, আত্মঅনুসন্ধান এবং নিজের মতো করে সময় কাটানোয়।











