জোরপূর্বক গুমের একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় নতুন কিছু সূত্র পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এর ফলে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীকে ঘিরে নতুন করে তদন্তের একটি উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সাগর-রুনি হত্যা মামলায় রোকেয়া প্রাচীর নাম উঠে এসেছে, যদিও এ নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায়নি এখনো।
দেশের সংবাদমাধ্যমে ডেইলি ওয়াদা তাদের খবরে জানিয়েছে,’সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বিতর্কিত সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জোরপূর্বক গুমের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা এসব তথ্য পান।‘

সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ওই তদন্তের অংশ হিসেবে একটি মুঠোফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে এক সেনা সার্জেন্টের সন্ধান পান তদন্তকারীরা। পরে ওই সার্জেন্টকে নজরদারিতে রাখা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে অপ্রত্যাশিতভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এর ফলে ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা এই হত্যা মামলার তদন্তে নতুন একটি সম্ভাব্য সূত্র সামনে এসেছে।
‘বড় কিছু ঘটতে পারে’
এছাড়াও ডেইলি ওয়াদা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক তদন্তকারী তাঁদেরকে বলেছেন, সাংবাদিক দম্পতি হত্যার কিছুদিন আগে জিয়াউল আহসান ওই সার্জেন্টকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
তদন্তকারী বলেন, “২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ সাগর-রুনি হত্যার ঠিক দুই দিন আগে, ১১ ফেব্রুয়ারি, সাবেক মেজর (অব.) জিয়াউল আহসান ওই সার্জেন্টকে ডেকে পাঠান। জিয়াউল আহসান তাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আগামী দুই দিনের মধ্যে বড় কিছু ঘটতে পারে। প্রস্তুত থাকুন।’”
তদন্তকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিনই জিয়াউল আহসান সার্জেন্টকে রোকেয়া প্রাচীর কাছ থেকে দুটি ডিস্ক সংগ্রহ করতে নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী সার্জেন্ট রোকেয়া প্রাচীর কাছ থেকে দুটি ডিস্ক সংগ্রহ করেন বলে জানান তদন্তকারী। তিনি আরও বলেন, জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
ওই ডিস্ক দুটির সঙ্গে সাংবাদিক দম্পতি হত্যার মোটিভ বা হত্যার কারণের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখন খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর সাগর ও রুনির মালিকানাধীন দুটি ল্যাপটপ এবং সাগরের মুঠোফোন নিখোঁজ হয়ে যায়। তবে রুনির মুঠোফোন এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণালংকার বাসায় অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল।
গতকাল রবিবার প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম প্রকাশ্যে জানান, অন্য একটি মামলার তদন্তের সময় সিডিআর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে একজন ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের’ সম্ভাব্য যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এক সংবাদ সম্মেলনে আমিনুল বলেন, “আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে, সিডিআর পর্যালোচনা করে আমরা একজন ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের’ সঙ্গে সাগর-রুনি ঘটনার একটি যোগসূত্র পেয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “আমরা যে তথ্য পেয়েছি, তা নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।”
আমিনুল ইসলাম বলেন, সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তাধীন। ট্রাইব্যুনালের তদন্তে পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সহযোগিতা পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হবে।
প্রসিকিউশন আরও জানিয়েছে, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড একটি পৃথক হত্যা মামলা। ফলে এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত নয়। বিদ্যমান ফৌজদারি আইনের অধীনে সংশ্লিষ্ট আদালতে এই মামলার বিচার হবে।
যেদিন হত্যা করা হয়
মাছরাঙা টেলিভিশনের সংবাদ সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তাঁর স্ত্রী মেহেরুন রুনিকে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় আটজনকে আসামি করা হয়।
প্রথমে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মামলাটির তদন্ত করে। পরে তদন্তভার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স এবং পিবিআই মামলাটির তদন্ত করছে। হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তকারীরা এখনো আদালতে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি। গত ২৭ আগস্ট আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা ১২৯তমবারের মতো বাড়িয়ে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।








