মুস্তাফা মনোয়ারের বিদায়
এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর। তেমনই এই পৃথিবী আর পাবে না বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার কে। দেশের কয়েক প্রজন্মের আবেগ ও শৈশবের সাথে জড়িত খ্যাতিমান ও বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার মারা গেছেন। আজ ২৯ জুন সোমবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বিদায়কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
চলতি মাসের ১৪ তারিখে অসুস্থ অবস্থায় মুস্তাফা মনোয়ারকে এখানে ভর্তি করা হয়। সেসময় তার স্ত্রী মেরী মনোয়ার জানিয়েছিলেন, ফুসফুসে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়।
এরপর কয়েকদিন আগে তার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে নেয়া হয়। কিন্তু আবারও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পুনরায় ভেন্টিলেটরে নেয়া হয়। আর আজ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ হিসেবে খ্যাত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন।
শিল্পীর ব্যক্তিগত সহকারী রুবেল মিয়া গণমাধ্যমকে জানান, হাসপাতাল থেকে মুস্তাফা মনোয়ারকে নেওয়া হবে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে। এরপর ধানমন্ডি ১ নম্বরে শিল্পীকে তাঁর বাসভবনে নেওয়া হবে। তাঁর জানাজা ও দাফন কোথায় হবে, সে বিষয়ে পরে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হবে।
জন্ম ও মুক্তিযুদ্ধ
মুস্তাফা মনোয়ার শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে ‘একুশে পদক’ পান। এ ছাড়া নানা সম্মাননায় ভূষিত ছিলেন তিনি।
মুস্তাফা মনোয়ার কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে। এই কিংবদন্তী ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে।
ছোটবেলা থেকেই মুস্তাফা মনোয়ারের ছবি আঁকা আর গানের প্রতি ছিল বিশেষ আকর্ষণ। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় যোগ দেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। জেলে যান ছবি আঁকার অপরাধে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম স্থপতি তিনি। সৃষ্টি করেছেন ‘পারুল’-এর মতো জনপ্রিয় চরিত্র। জড়িত ছিলেন ‘মীনা’র সঙ্গে। নির্মাণ করেছেন শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে বাংলাদেশের সবচেয়ে মানসম্পন্ন ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’। তাঁর নির্মিত অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ও ব্যাপক সমাদৃত।
মুস্তাফা মনোয়ারের কর্মজীবনের শুরু পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা, শিল্পকলা একাডেমিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত মলিন চেহারা মুস্তাফা মনোয়ারকে ব্যথিত করে। তাই বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সেই শরণার্থীশিবিরেই আয়োজন করেন জীবনের প্রথম পাপেট শো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশের শিল্পজগতে মুস্তাফা মনোয়ার মেলে ধরেন পাপেটের এক নতুন রূপ।
তাঁর সেই যাত্রায় পরে হয়ে উঠে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের অন্যতম জনপ্রিয় শো। তিনি কয়েক প্রজন্মের মানুষদের শৈশবকে গড়েছেন অনন্য আনন্দে। তাঁর বিদায়ে শোক জানিয়েছেন দেশের আপামর জনতা থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের ব্যক্তিত্বরা। শোক প্রকাশ করেছেন শোবিজ তারকারাও।


