ইলিয়াস কাঞ্চনের চিকিৎসা বৃত্তান্ত
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জনপ্রিয় অভিনেতা, সমাজসেবক এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বর্তমানে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন। দীর্ঘদিন ধরে ব্রেন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন তিনি। গত বছর থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই অভিনেতা। পরিবারের সদস্যদের সান্নিধ্যে থেকে চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও তার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি এখনো দেখা যায়নি।
জানা গেছে, গত বছরের আগস্ট মাসে লন্ডনের একটি হাসপাতালে ইলিয়াস কাঞ্চনের মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা তার ব্রেনে থাকা টিউমারের বড় একটি অংশ সফলভাবে অপসারণ করতে সক্ষম হন। তবে টিউমারটির অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পুরোপুরি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী পরীক্ষায় চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে তিনি ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত।

অস্ত্রোপচারের পর থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ ও জটিল চিকিৎসা প্রক্রিয়া। প্রথম ধাপে টানা তিন মাস কেমোথেরাপি দেওয়া হয় তাকে। বর্তমানে তিনি ওরাল থেরাপির দ্বিতীয় ধাপে রয়েছেন। চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সপ্তাহে পাঁচ দিন করে ১২ সপ্তাহের চিকিৎসা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে প্রায় ৬০টি কেমোথেরাপি গ্রহণ করতে হয়েছে তাকে। এরপর তিন মাসের প্রথম ধাপের ওরাল থেরাপি শেষ করে বর্তমানে আরও তিন মাসের দ্বিতীয় ধাপের ওরাল থেরাপি নিচ্ছেন তিনি।
ইলিয়াস কাঞ্চনের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর ভাইস চেয়ারম্যান লিটন এরশাদ জানিয়েছেন, দীর্ঘ চিকিৎসার পরও অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। বুধবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “কাঞ্চন ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা মোটামুটি আগের মতোই রয়েছে। উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। বর্তমানে যে থেরাপি চলছে, তা আগামী ৩০ জুলাই পর্যন্ত চলবে। এরপর চিকিৎসকেরা নতুন করে তার শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করবেন এবং পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করবেন।”
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসারটি এখনো মস্তিষ্কের সেই একই স্থানে রয়েছে, যেখানে প্রথম শনাক্ত হয়েছিল। তবে আশার কথা হলো, এটি শরীরের অন্য কোনো অংশে ছড়িয়ে পড়েনি। চিকিৎসকেরা এটিকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তাদের ধারণা, দ্বিতীয় ধাপের ওরাল থেরাপি শেষ হওয়ার পর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি দেখা যেতে পারে।

তবে প্রতিদিনের জীবনযাপন এখন আর আগের মতো সহজ নয়। ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইলিয়াস কাঞ্চন এখন ধীরে ধীরে কথা বলতে পারেন। কিন্তু কথাবার্তায় জড়তা রয়েছে এবং অনেক সময় একটি পূর্ণ বাক্য শেষ করতেও কষ্ট হয় তার। কয়েক মিনিট কথা বলার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েন তিনি। খাবার গ্রহণ মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে।
একসময় চলচ্চিত্রের শুটিং, সামাজিক আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার দাবিতে দেশজুড়ে ব্যস্ত সময় কাটানো এই মানুষটির দিন এখন কাটছে হাসপাতালের ফলোআপ, চিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। লন্ডনে মেয়ের বাসায় থেকে মেয়ে, জামাতা ও নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যই এখন তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
সম্প্রতি পরিবারের সঙ্গে কাটানো কিছু হাস্যোজ্জ্বল ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে বাস্তবতা হলো, সুস্থতার পথ এখনো দীর্ঘ। তবু পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং ভক্তদের প্রার্থনা ও ভালোবাসাকে সঙ্গে নিয়েই কঠিন এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ইলিয়াস কাঞ্চন।