অদম্য যোদ্ধা আয়েশা আক্তার
সমাজের চোখে তিনি এখন আত্মবিশ্বাস ও হার না মানা এক পরিশ্রমী যোদ্ধার উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁকে দেখে দুঃখে-কষ্টে ও চরম হতাশায় ভোগা মানুষটিও অনুপ্রাণিত হন। জন্ম থেকেই তার দুটি হাত নেই, তবু তিনি নিজেকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন ওপার বিস্ময়ে। সমাজের অবহেলা আর অভাবের তাড়নায় বাবার তাঁকে সার্কাসে বিক্রি করে দেওয়ার পায়তারা সব বাঁধা অতিক্রম করে আজ আয়েশা আক্তার হয়ে উঠেছেন এক বীর সৈনিক। এই উপাধি তাঁকে দিতেই হয়,কারণ এটি তিনি অর্জন করেছেন তিলে তিলে। আর সেকারণেই চীনের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আয়েশার গল্প প্রদর্শনী করা হচ্ছে।
আয়েশা আক্তার আজ বাংলাদেশের সেসকল মানুষের কাছে অদম্য এক ইচ্ছাশক্তির প্রতীক যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায়, প্রচন্ড অবহেলায় বসবাস করছেন। হাত নেই তাই পা দিয়ে লিখেই সম্প্রতি মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ অর্জন করেছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়াহাট গ্রামের মেয়ে আয়েশা আক্তার।

আয়েশার এই জীবনব্যাপি দীর্ঘ লড়াই, সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প নিয়ে সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে বিশেষ প্রামাণ্য তথ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’। শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনায় এটি পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেছেন চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি মোস্তফা মল্লিক। গত ১৭ মে রাত ১০টা ২০ মিনিটে চ্যানেল আইয়ের পর্দায় ২৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের এই তথ্যচিত্র প্রচারিত হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডেরও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে এই ডকুমেন্টারি। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চীনা ভাষায় ‘পায়ের ছাপ’
এরই মধ্যে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশপ্রেমী লিউ জিই। তিনি ইতিমধ্যেই চীনা ভাষায় ‘পায়ের ছাপ’-এর অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন। প্রখ্যাত এই ব্যক্তিত্ব আয়েশার জীবন-সংগ্রামকে চীনের ৮০-র দশকের একজন উচ্চপর্যায়ের পক্ষাঘাতগ্রস্ত (শারীরিক প্রতিবন্ধী) কিংবদন্তি নারী ‘ঝাং হাইদি’-র সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার গল্প চীনে অসম্ভব জনপ্রিয়।
লিউ জিই জানিয়েছেন, আগামী মাসে চীনের বিখ্যাত ‘সাউথ চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটি’ ও ‘সাউথ চায়না অ্যাগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি’-তে এই তথ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় দুটির গণযোগাযোগ বিভাগের শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, আয়েশার এই কাহিনি এখন চীনের বুদ্ধিজীবী ও চলচ্চিত্র মহলে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।

এই কার্যক্রমে লিউ জিইয়ের সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছেন জু দি। তাঁরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি চীনের তিনটি হাইস্কুলেও আয়েশার এই জীবন-সংগ্রামের চলচ্চিত্রটি দেখানোর ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়েছে, যাতে আয়েশার অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি চীনের তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জীবন গঠনে একটি বড় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এই তথ্যচিত্রটিতে দেখানো হয়েছে,কীভাবে শৈশবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গিয়ে শিক্ষকদের বাঁধার মুখে পড়েন আয়েশা। এরপর স্থানীয় একজন ব্যক্তি ওই শিক্ষকদের ও প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ দিয়ে আয়েশাকে স্কুলে ভর্তি করান।
‘কিংবদন্তি অ্যাওয়ার্ড’
২০১২ সালে এসএসসি ও ২০১৪ সালে এইচএসসি পাসের পর আয়েশার জীবন বদলে যায় চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত মোস্তফা মল্লিকের করা একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টের মাধ্যমে। মোস্তফা মল্লিকের হাত ধরেই আয়েশা প্রথম ঢাকায় এসে ‘কিংবদন্তি অ্যাওয়ার্ড’ পান এবং এককালীন দুই লাখ টাকা অনুদান লাভ করেন। এই টাকা দিয়ে আয়েশা তাঁদের ছোট টিনের ঘরটি পাকা করেন। পরবর্তী সময় একজন ফ্রান্সপ্রবাসী ব্যবসায়ীর সহায়তায় আয়েশা উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যান এবং ২০২৫ সালে মাস্টার্সে প্রথম বিভাগ অর্জন করেন।
আয়েশার এই অভূতপূর্ব সাফল্যে বুয়েটের অধ্যাপক এ বি এম হারুন উর রশীদ, সাউথ অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মাহফুজুল আজিজ, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল্লাহ্ আল মামুন আয়েশাকে পুরো জাতির অনুপ্রেরণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেন, ‘শহরের সব সুবিধা পেয়ে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া আর প্রত্যন্ত গ্রামের হাতহীন আয়েশার ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার তফাত আকাশ-পাতাল। সে অনেকের জন্য আই-ওপেনার (চোখ খুলে দেওয়ার মতো উদাহরণ)।’
বর্তমানে কি করছেন?
মাস্টার্স শেষ করে আয়েশা এখন ঘরে বসে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে পড়াচ্ছেন। তবে অভাবের সংসার আর একটি স্থায়ী চাকরির আকুতি তাঁর এখনো কাটেনি। তথ্যচিত্রটি প্রচারের পর আয়েশার পাশে দাঁড়িয়েছে চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর ঘোষণা দিয়েছেন, স্থায়ী চাকরি না হওয়া পর্যন্ত চ্যানেল আই আয়েশাকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে সম্মানী বা জীবনধারণের ভাতা প্রদান করবে।
পরিচালক মোস্তফা মল্লিক অনুভূতি জানিয়ে বলেন, ‘বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে আমি আয়েশাকে ফলো করেছি, তার প্রতিটি স্ট্রাগল দেখেছি। চ্যানেল আই আমাকে এই বায়োডকটি তৈরি করার জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা ও সুযোগ দিয়েছে। আয়েশা প্রমাণ করেছে, জীবনকে জয় করতে হাত লাগে না, অটল ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।’
এই বিশেষ প্রামাণ্য তথ্যচিত্র নির্মাণে অন্যতম পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ইস্টার্ন ইনস্যুরেন্স ও মালিশাএডু।


