বনলতা সেন সিনেমার টিজার
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন খুব কম কবিতা আছে, যা কবিতাপ্রেমী না হলেও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কবি জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন ঠিক তেমনই এক অনিবার্য উচ্চারণ। ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ এই চিরকালীন ক্লান্ত পথিকের শান্তির খোঁজ এবার ধরা দিচ্ছে বড় পর্দায়। নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল নির্মাণ করছেন তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘বনলতা সেন’। সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে সিনেমাটির প্রথম আনুষ্ঠানিক টিজার।
মাত্র ৫৪ সেকেন্ডের এই টিজার প্রচলিত অর্থে কোনো চলচ্চিত্রের ঝলক নয়; বরং এটি ক্যামেরায় নির্মিত এক টুকরো চিত্রশিল্প। শুরু থেকেই টিজারটি দর্শককে নিয়ে যায় এক রহস্যময়, ধূসর এবং নিঃসঙ্গ জগতে। জনমানবহীন বালুকাময় প্রান্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বই, খাতা আর কাগজ যেন স্মরণ করিয়ে দেয় কবির জীবদ্দশায় অবহেলিত থেকে যাওয়া তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র কথা।

এই নিস্তব্ধতার মাঝখানে বিস্তৃত দিগন্তের তাকিয়ে আছেন এক নারী। তিনিই কি সেই বনলতা সেন? যার কাছে ক্লান্ত পথিক খুঁজে পেয়েছিল “দু’দণ্ড শান্তি”? টিজারে তাঁর দীর্ঘ চুল যেন সরাসরি মনে করিয়ে দেয় কবিতার সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।”
আর সেই নারীর সামনে দিয়ে সাদা পোশাকে হেঁটে যেতে দেখা যায় এক পুরুষকে। তিনি যেন স্বয়ং জীবনানন্দ দাশ-রূপসী বাংলার নির্জন কবি, যিনি হাজার বছর ধরে পথ হেঁটে চলেছেন।
বুদ্ধদেব বসুর প্রতিরূপ
টিজারের আরেকটি আকর্ষণ রহস্যময় এক চরিত্র, যিনি চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কাগজগুলো যত্নে কুড়িয়ে নিচ্ছেন। একইসঙ্গে তিনি তাকিয়ে আছেন জীবনানন্দ ও বনলতার হেঁটে চলার দিকে। চরিত্রটি কি তবে আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক-সাহিত্যিক ও জীবনানন্দ পৃষ্ঠপোষক বুদ্ধদেব বসুর প্রতিরূপ? যিনি না থাকলে হয়তো জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যভুবন এত দ্রুত পাঠকের কাছে পৌঁছাত না।
সিনেমাটোগ্রাফিক চিত্রকর্ম
টিজারজুড়ে সিনেমাটোগ্রাফির ফ্রেমিং, কালার গ্রেডিং এবং ভিজ্যুয়াল কম্পোজিশন এক ধরনের চিত্রকর্মের আবহ তৈরি করেছে। প্রতিটি দৃশ্য যেন ক্যানভাসে আঁকা একেকটি ফ্রেম। সংলাপহীন এই টিজারে আবহসংগীতও আলাদা করে মনোযোগ কাড়ে। বাঁশি ও তারের মিশ্রণে তৈরি জীবনানন্দময় বিষণ্ণতা অথচ প্রশান্তিময় সুর পুরো টিজারজুড়ে এক গভীর আবেগ ও রহস্যের আবহ তৈরি করেছে।
যারা অভিনয় করছেন
২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি অনুদান পাওয়া ‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলা। অন্যদিকে কবি জীবনানন্দ দাশ চরিত্রে দেখা যাবে অভিনেতা খায়রুল বাসারকে। বুদ্ধদেব বসু চরিত্রে অভিনয় করেছেন শরীফ সিরাজ। এছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও রূপক চরিত্রে রয়েছেন গাজী রাকায়েত, সোহেল মণ্ডল, নাজিবা বাশার, প্রিয়ন্তী উর্বী, রূপন্তী আকিদ এবং সুমাইয়া খুশি।
বাস্তবতা ও রূপকের মিশেলে নির্মিত এই বহুল প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্রটি দীর্ঘ আইনি ও অর্থনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে মুক্তির পথে। এখন অপেক্ষা, বড় পর্দায় মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের কল্পনায় জীবনানন্দ ও বনলতা সেন ঠিক কতটা জীবন্ত হয়ে ওঠেন তা দেখার।


