কান চলচ্চিত্র উৎসব
আজ (১২ মে) শুরু হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ কান চলচ্চিত্র উৎসব । এবারের ৭৯তম আসরটি শুরু হবে পিয়েরে সালভাদোরির রোমান্টিক কমেডি সিনেমা ‘দ্য ইলেকট্রিক কিস’-এর প্রদর্শনীর মাধ্যমে।
এবারের কান উৎসব বেশ ব্যতিক্রম। ২০২৬ সালেও এখানে উপস্থিত ছিলেন হলিউডের বিখ্যাত সব তারকারা। কিন্তু এবারের কান উৎসবে নেই হলিউডের বড় কোনো ব্লকবাস্টার সিনেমা। এমনকি গত এক দশকে কানে নিয়মিত জায়গা পাওয়া ‘স্টার ওয়ারস’ এর মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিও এবার অনুপস্থিত। এবারের লাইনআপে হলিউডের পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্বের খ্যাতিমান সব নির্মাতারা। যাঁদের কাজ মূলত গল্পনির্ভর ও শিল্পঘেঁষা। এবারের প্রতিযোগিতা তাই হয়ে উঠেছে শিল্পের সাথে শিল্পের প্রতিযোগিতা, কল্পনার সাথে কল্পনার প্রতিযোগিতা, আছে রাজনীতি, এআই, যুদ্ধ। এছাড়া, প্রতিবারের মতো এবারো থাকছে আলো ঝলমলে রেড কার্পেটে তারকাদের নজরকাড়া উপস্থিতি। সব মিলিয়ে এবারের কান হতে যাচ্ছে এক ব্যতিক্রমী আসর।
প্রতিযোগিতা বিভাগ
এবারের কান উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা পেয়েছে মোট ২২টি সিনেমা। এখান থেকে নির্বাচিত ছবিই পাবে কানের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণপাম। বিজয়ী সিনেমার ঘোষণা আসবে উৎসবের সমাপনী দিন ২৩ মে’তে।
এবারের প্রতিযোগিতায় আছেন স্পেনের পেদ্রো আলমোদোভার, জাপানের সংবেদনশীল গল্পকার হিরোকাজু কোরে-এদা এবং রোমানিয়ান পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান মুঙ্গিউ। পাশাপাশি রয়েছেন নতুন প্রজন্মের আলোচিত নির্মাতা লুকাস দন্ত ও লিয়া মাইসিয়াস। থাকছেন আলোচিত ইরানি নির্মাতা আসগর ফরহাদিও।
তবে উৎসবের সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে দক্ষিণ কোরীয় পরিচালক না হং–জিনের ‘হোপ’। আলোচনার কেন্দ্রে আছে জাপানের ‘শিপ ইন দ্য বক্স’। বাস্তব জীবনের দম্পতি মাইকেল ফাসবেন্ডার ও অ্যালিসিয়া ভিকান্দর অভিনীত ‘হোপ’ ছবিটি নিয়ে ইতিমধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এছাড়া প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ নিয়েও চলচ্চিত্র সমাজে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
মোট সিনেমা
উৎসব পরিচালক থিঁয়োরি ফ্রেমো জানিয়েছেন, এবারের আসরে ২ হাজার ৫৪১টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র জমা পড়েছে। এক দশক আগের তুলনায় যা এক হাজারটির বেশি। ১৪১টি দেশ থেকে এসেছে এই বিপুলসংখ্যক চলচ্চিত্র যা প্রমাণ করে বিশ্ব এখন আরো বেশি সিনেমার দিকে ঝুঁকেছে।
কানে প্রথমবার নেপাল
প্রথমবারের মতো এবার কানে জায়গা পেয়েছে নেপালের সিনেমা। আঁ সার্তে রিগায় নেপালের সিনেমা ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’ জায়গা পেয়েছে। এটির পরিচালক অবিনাশ বিক্রম শাহ। বনঘেরা নেপালি এক গ্রামে বসবাসকারী কিন্নর সম্প্রদায়ের গল্প নিয়ে তৈরি এটি। এতে কেন্দ্রীয় চরিত্র পিরাতি, যিনি ভালোবাসা আর নিজের সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতার মধ্যে আটকে যান। নিখোঁজ এক তরুণীকে খুঁজতে গিয়ে তিনি মুখোমুখি হন সমাজের নির্মম বাস্তবতার। দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনকে এত গভীরভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার ঘটনা বিরল। ফলে ছবিটি ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিবেশকদের নজর কেড়েছে।
ফরাসী সিনেমা
এবারের কান উৎসবে ফরাসিভাষী সিনেমার আধিক্যও চোখে পরার মতো। মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে বেশ কয়েকটি ফরাসি ভাষার ছবি জায়গা পেয়েছে। এর মধ্যে কিছু ছবির নির্মাতা আবার বিদেশি। এবারের আসরে একই সঙ্গে তিনজন ফরাসি নারী নির্মাতার ছবিও জায়গা পেয়েছে আসরটির মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে যা প্রমাণ করে নারী পরিচালকদের সিনেমায় ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। এবারের উৎসবে প্রধান জুরির দায়িত্ব পালন করছেন নন্দিত কোরীয় নির্মাতা পার্ক–চান উক।
জন লেনন ও এআই
পরিচালক স্টিভেন সোডারবার্গের তথ্যচিত্র ‘জন লেনন: দ্য লাস্ট ইন্টারভিউ’ নিয়ে আলোচনা উঠেছে অনেক। ছবিটিতে মৃত্যুর আগে জন লেননের দেওয়া এক অডিও সাক্ষাৎকারকে দৃশ্যমান করতে ব্যবহার করা হয়েছে এআই–জেনারেটেড ছবি। এআই’য়ের এমন ব্যবহারকে কেউ সৃজনশীল আকারে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন এটি মৃত শিল্পীর স্মৃতির বাণিজ্যিক ব্যবহার।
সম্প্রতি গোল্ডেন গ্লোব কর্তৃপক্ষ এআই ব্যবহারের নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে। অস্কার কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে এআই জেনারেটেড সিনেমা অস্কারে জায়গা পাবে না। ফলে কান উৎসবে এআই নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
হলিউডের নিভু নিভু আলো
হলিউড সিনেমার প্রিমিয়ার সবসময়ই কানের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে থাকে। কিন্তু এবার বড় কোনো মার্কিন স্টুডিও তাদের ব্লকবাস্টার নিয়ে নেই। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক প্রচারণায় ঝুঁকে পড়া, খরচ কমানো এবং কানের কঠোর সমালোচকদের ভয় এই তিন কারণেই হলিউড এবার অনেকটা দূরে থেকেছে।
জন ট্রাভোল্টার প্রত্যাবর্তন
তবে হলিউডের একেবারে কেউ না থাকলেও আছে জন ট্রাভোল্টা। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘প্রপেলার ওয়ান–ওয়ে নাইট কোচ’ নিয়ে হাজির হচ্ছেন তিনি। বিমানপ্রেমী এই অভিনেতার ছবিটি ‘বিমানযাত্রার স্বর্ণযুগ’ নিয়ে নির্মিত। ১৯৯৭ সালে জন ট্রাভোলটার লেখা একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে এটি তৈরি হয়েছে সিনেমাটি। এতে অভিনয় করেছেন ক্লার্ক শটওয়েল, কেলি এভিস্টন কুইনেট, এলা ব্লেউ, ওলগা হফম্যান। এক মা ও সন্তানের সাধারণ এক ভ্রমণ কীভাবে অদ্ভুত এক অ্যাডভেঞ্চারে রূপ নেয়, তা নিয়েই সিনেমাটির গল্প। এটি উৎসবে ক্যামেরা দ’অর বিভাগেও মনোনয়ন পেয়েছে।
তারকাদের মেলা
হলিউডের বড় স্টুডিওর সিনেমা না থাকলেও স্কারলেট জোহানসন ও অ্যাডাম ড্রাইভার আসছেন ‘পেপার টাইগার’–এর প্রচারে। রামি মালিকও থাকছেন তাঁর অভিনীত ‘দ্য ম্যান আই লাভ’ সিনেমা নিয়ে। এ ছাড়া লালগালিচায় দেখা যাবে হাভিয়ের বারদেম, ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, উডি হ্যারেলসন, কেট ব্লাঞ্চেট ও জুলিয়ান মুরকে। এবার বিশেষ সম্মাননা পাচ্ছেন পিটার জ্যাকসন ও বারব্রা স্ট্রেইস্যান্ড।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পেট্রোভিচ
রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা আন্দ্রেই পেট্রোভিচ জাভ্যাগিনসেভের প্রত্যাবর্তনও এবারের উৎসবের বড় ঘটনা। কোভিডে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ছাড়ার পর এটাই তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র। তিনি আসছেন সিনেমা ‘মিনোটর’ নিয়ে। সিনেমায় তিনি দেখিয়েছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার মধ্যবিত্ত সমাজ কীভাবে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের সংকটে পড়ে।
‘হ্যান্ড অব গড’
সিনেমার উৎসব হলেও এবারের কানে ফুটবলও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। থাকছে এরিক কাঁতোয়াঁকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘কাঁতোয়াঁ’। আরো থাকছে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সেই বিতর্কিত ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ নিয়ে তথ্যচিত্র ‘দ্য ম্যাচ’। সেখানে উঠে আসবে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের গল্প।
রাজনৈতিক সিনেমা
বিশ্বরাজনীতির ছোঁয়া লেগেছে কানেও। আছে ইরানের রাজনৈতিক দমন–পীড়ন নিয়ে নির্মিত ‘রিহার্সেল ফর আ রেভোল্যুশন’। আছে নাইজেরিয়ার চলচ্চিত্রশিল্প ‘নলিউড’ থেকে যমজ নির্মাতা অ্যারি এসিরি ও চুকো এসিরির সিনেমা ‘ক্লারিসা’।
বলিউড
ভারতীয় বেশ কিছু তারকা কানের রেড কার্পেটে উপস্থিত হয়েছেন। ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, আলিয়া ভাট, করণ জোহর, তারা সুতারিয়াসহ আরও অনেকে বলিউডকে প্রতিনিধিত্ব করছেন কান উৎসবে।


