ইরফান খান
ভারতীয় চলচ্চিত্রের দুই কিংবদন্তি তারকা ইরফান খান ও বিদ্যা বালান। অথচ তাদের দুজনকে একসঙ্গে পর্দায় দেখা গেছে মাত্র একবারই। ক্যারিয়ারের শুরুতে করা সেই সিনেমাটি গত ২৫ বছর ধরে ছিল অন্তরালে। অবশেষে অভিনেতা ইরফান খানের ষষ্ঠ প্রয়াণবার্ষিকীতে সেই হারানো অমূল্য স্মৃতি মুক্তি পেল ইউটিউবে। দীর্ঘ ২৫ বছর পর মুক্তি পেল ইরফান খানের ‘দ্য লাস্ট টেন্যান্ট’ সিনেমাটি।
২০০০ সালের দিকে নবীন পরিচালক সার্থক দাশগুপ্ত অত্যন্ত সীমিত বাজেটে এই সিনেমার কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর মূল ফুটেজটি হারিয়ে যায়। দীর্ঘ দুই দশক চেষ্টার পর পরিচালক ছবিটির একটি ভিএইচএস কপি উদ্ধার করতে সক্ষম হন। ইরফানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেই অস্পষ্ট কিন্তু অমূল্য ফুটেজটিই ডিজিটাল মাধ্যমে দর্শকদের সামনে আনা হয়েছে।
বিদ্যা বালানের স্মৃতিচারণা
বিদ্যার ক্যারিয়ারে টেলিভিশনের পর এটিই সম্ভবত প্রথম সিনেমা। এই ছবিটির মাধ্যমেই প্রথমবার বড় পর্দায় পা রেখেছিলেন তিনি। অন্যদিকে, ইরফান খানও তখন ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা তৈরির লড়াই চালাচ্ছিলেন। বিদ্যা বালন স্মৃতিচারণা করে বলেন, এই ছবিটি আমাকে আমার শুরুর দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ইরফানের সঙ্গে কাজ করা তখন থেকেই আমার জন্য বিশেষ কিছু ছিল।’

সিনেমাটির গল্প আবর্তিত হয়েছে একজন সঙ্গীতশিল্পীকে ঘিরে। দেশ ছাড়ার ঠিক আগে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নেয় সে। সেই নিস্তব্ধ ও রহস্যময় পরিবেশে মানুষের একাকীত্ব, স্মৃতি ও সঙ্গীতের এক অদ্ভুত রসায়ন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ২৯ এপ্রিল মুক্তি পাওয়ার পর ছবিটি ইউটিউবে দেখেছেন লাখো দর্শক।

তবে ইরফান ভক্তদের কাছে এটি কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং প্রিয় অভিনেতার এক বিরল উপহার। করপোরেট ক্যারিয়ার ছেড়ে আসা পরিচালক সার্থকের অভিষেক ছবি হিসেবেও এটি চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।
ইরফান খানের সিনেমাব্যাপ্তি
এই অভিনেতা বলিউড, হলিউড, বাংলাদেশি (ডুব: নো বেড অব রোজেস), এমনকি তেলুগু চলচ্চিত্রেও কাজ করছেন। ৩৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি ৫০টির অধিক দেশীয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
ইরফান খান শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার-সহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। চলচ্চিত্র সমালোচক, সমসাময়িক অভিনয়শিল্পী ও সিনেমা বিশেষজ্ঞরা তাকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী বলে গণ্য করে থাকেন। ২০১১ সালে ভারত সরকার তাকে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী পদকেও ভূষিত করেন।

সিনেমায় অভিষেক
ইরফান খান ১৯৬৭ সালের ৭ই জানুয়ারি ভারতের জয়পুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে তিনি ক্রিকেটার ছিলেন। নির্বাচিত হয়েছনে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ভিত্তি হিসেবে সুপরিচিত সিকে নায়ুডু টুর্নামেন্টের অনূর্ধ্ব ২৩ দলে। কিন্তু অর্থায়নের অভাবে তিনি এই আসরে খেলতে পারেননি।

এরপর অভিনয়ে নাম লেখান। বলিউডে তাঁর অভিষেক হয় শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে একাডেমি পুরস্কার মনোনীত মীরা নায়ারের সিনেমা সালাম বম্বে! (১৯৮৮) চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। এরপর সুদীর্ঘ তিন যুগের অভিনয় জীবন। যেখানে উপহার দিয়েছেন কালজয়ী সব সিনেমা ও হৃদয়গ্রাহী অভিনয়।
অসুস্থতা ও মৃত্যু
ইরফান খান প্রায় এক বছর ধরে নিউরো এন্ডোক্রিন কর্কটরোগে অসুস্থ ছিলেন। পরে লন্ডনে এক বছর চিকিৎসা গ্রহণ শেষে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতে ফিরে আসেন।
এরপর ২০২০ সালের ২৮শে এপ্রিল বৃহদন্ত্রে্র জটিলতায় পড়েন। তাঁকে মুম্বাইয়ে অবস্থিত কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরের দিন ২৯শে এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তী অভিনেতা। আর সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ইরফান খানের ‘দ্য লাস্ট টেন্যান্ট’ হয়ে থাকলো এই অভিনেতার অনন্য স্মৃতি হিসেবে।


