ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা তুলে ধরা ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই মারা গেছেন।বিদায়কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তার পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, রোববার (২৬ এপ্রিল) সন্ধ্যায় নয়াদিল্লির লোধি রোড শ্মশানে রঘু রাইয়ের শেষকৃত্য হবে।

রঘু রাই ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, মৃত্যুর আগে তিনি নয়াদিল্লিতে বসবাস করছিলেন। এসম তিনি তাঁর ৫৭তম বই নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আলোকচিত্র জগতের এক ঐতিহাসিক যুগের অবসান ঘটল।

মুক্তিযুদ্ধ ও রঘু রাই
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতে আশ্রয় নেয় লাখো বাংলাদেশি শরণার্থী। তাঁদের চরম মানবিক সংকটের দৃশ্যগুলো রঘু রাই তুলে ধরেছিলেন তাঁর ক্যামেরায়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রঘু রাই ছিলেন ভারতের দ্য স্টেটমেন্ট পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্রী। এ সময় তিনি ভারতের আশ্রয়শিবিরের উদ্বাস্তু বাংলাদেশিদের অবর্ণনীয় কষ্টের চিত্র তুলে ধরেন তাঁর ক্যামেরায়। রঘু রায়ের তোলা মুক্তিযুদ্ধের ছবি ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্ত সেই সময় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নাড়া দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থীদের নিয়ে তাঁর এই অসামান্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ পদকে ভূষিত করে।

ঢাকায় ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণচিত্র

রঘু রাই ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের ঝাংয়ে (বর্তমানে পাকিস্তানে) জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় তিনি একজন পুরকৌশলী (সিভিল ইঞ্জিনিয়ার) ছিলেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের হাত ধরে আলোকচিত্র জগতে প্রবেশ তাঁর। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্রী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এরপর কলকাতার সাপ্তাহিক ‘সানডে’ ম্যাগাজিনের পিকচার এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রঘু রাইয়ের কর্মব্যাপ্তি
বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফটোগ্রাফিক সমবায় ‘ম্যাগনাম ফটোজ’-এর সদস্য ছিলেন রঘু রাই। তিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ভারতের শীর্ষস্থানীয় নিউজ ম্যাগাজিন ‘ইন্ডিয়া টুডে’র পিকচার এডিটর হিসেবে কাজ করেন। তিনি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, দলাই লামা, মাদার তেরেসা, সত্যজিৎ রায়দের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের আলোকচিত্র তুলেছেন।

রঘু রায়ের তোলা ছবি টাইম, লাইফ, জিও, লে ফিগারো, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজউইক, দ্য নিউইয়র্কার, ভোগের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। রঘু রাই দীর্ঘ কর্মজীবনে ১৮টির বেশি বই প্রকাশ করেন।
প্রোস্টেট ক্যানসার
রঘু রাইয়ের ছেলে আলোকচিত্রী নীতিন রাই জানিয়েছেন দুই বছর ধরে প্রোস্টেট ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বাবার প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ে দুই বছর আগে। তবে তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। এরপর তা পাকস্থলিতে ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও নিরাময় করা হয়। সম্প্রতি ক্যানসার তাঁর মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বয়সজনিত কিছু সমস্যাও দেখা দেয়।’
এই মহান ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভারত, বাংলাদেশসহ তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝেও। মুক্তিযুদ্ধের এই অকৃত্রিম বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশের মানুষরাও।


