প্রেক্ষাগৃহে তারেক রহমান ও জাইমা রহমান
শুক্রবার রাতে মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে ঢাকার সীমান্ত সম্ভার সিনেমা হলে সন্ধ্যা ৭টার শো তে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ঘটনাটি। তবে এই নিয়ে বেশ মিসইনফরমেশন ছড়ায় দেশের গণমাধ্যমগুলো। প্রথমে তাঁরা জানায়, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর কন্যা সিনেমা বনলতা এক্সপ্রেস দেখতে গিয়েছেন। তবে সিনেমা শেষ হওয়ার পরেই জানা যায় বনলতা এক্সপ্রেস নয়, তাঁরা দেখেছেন হলিউড সিনেমা ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’। ছবি দেখা ও এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান। ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’-প্রধানমন্ত্রীর দেখা এই সিনেমায় কী আছে? চলুন সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক।
২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় ওপেনিং রেকর্ড

মুক্তির পরই বিশ্বজুড়ে ১৪০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার আয় করে ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় ওপেনিংয়ের রেকর্ড গড়ে সিনেমা ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’। পাশাপাশি সমালোচকদের কাছ থেকেও পেয়েছে প্রশংসা। বিজ্ঞাননির্ভর কাহিনি, মহাকাশ অভিযানের রোমাঞ্চ আর মানবিক আবেগের গল্প এটি। যুক্তরাজ্য, চীন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ বিভিন্ন বাজারে দারুণ ব্যবসা করছে সিনেমাটি।
‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ শুরুর গল্প
সায়েন্স ফিকশন এই সিনেমাটির কেন্দ্রে আছেন রায়ান গসলিং, যিনি সাধারণ এক বিজ্ঞান শিক্ষক। পরে তিনিই হয়ে উঠেন মানবজাতিকে রক্ষার দায়িত্ব নেওয়া একমাত্র নায়ক। গল্পটি শুরু হয় প্রধান চরিত্র রায়ান গসলিং তথা রাইল্যান্ড গ্রেস-এর একটি অদ্ভুত, অত্যাধুনিক কক্ষে ঘুম থেকে জেগে ওঠার মাধ্যমে। ঘুম থেকে জেগে উঠে তিনি দেখেন তিনি একা এবং তাঁর পাশে পড়ে আছে দুই মৃত শরীর।
তখনও তার কোনো স্মৃতি নেই- সে কে, কোথায় আছে, বা কেন এখানে এসেছে-কিছুই সে মনে করতে পারছে না। তার চারপাশে রয়েছে উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং রোবোটিক বাহু, যা তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যত্ন নিচ্ছে বলে মনে হয়। দীর্ঘ সময়ের ঘুম বা কোমা থেকে উঠে আসার মতো তার শরীর অত্যন্ত দুর্বল।

ধীরে ধীরে যখন সে চেতনা ফিরে পেতে থাকে-তখনও সে ভাষা, বিজ্ঞান, এমনকি নিজের নামের মতো মৌলিক বিষয়গুলো মনে করার জন্য সংগ্রাম করে। তাঁর চারপাশের পরিবেশটি অস্বাভাবিকভাবে জীবাণুমুক্ত ও কৃত্রিম মনে হয়, যা ইঙ্গিত দেয় যে সে সম্ভবত মহাকাশে রয়েছে। সিনেমায় রায়ান গসলিংয়ের সাথে দর্শকও সবকিছু সময়ে সময়ে আবিষ্কার করতে থাকে যে কি হচ্ছে। এরপরই তিনি বুঝতে পারেন, পৃথিবীকে এক ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা তাঁর লক্ষ্য। সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে অ্যান্ডি উইয়ারের একই নামের উপন্যাস থেকে।
ছবিটি পরিচালনা করেছেন ফিল লর্ড ও ক্রিস্টোফার মিলার। এই নির্মাতারা এর আগে ‘২১ জাম্প স্ট্রিট’, ‘দ্য লেগো মুভি’র মতো জনপ্রিয় কাজ করেছেন। তাঁদের হাত ধরে ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ হয়ে উঠেছে ভিজ্যুয়ালি আকর্ষণীয় ও আবেগঘন এক মহাকাশ অভিযান।
‘ইন্টারস্টেলার’-এর ছায়া
সিনেমাটি নিয়ে সমালোচকরা বলছেন, এটি ‘চিন্তাকে প্রসারিত করা সায়েন্স ফিকশন’, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ্য। আবার বলছেন, গল্পে ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’-এর ছায়াও কিছুটা পাওয়া যায়। তবে প্রায় সবাই একমত, গসলিংয়ের অভিনয়ই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি। গসলিং নিজেই জানিয়েছেন, এ ছবিতে কাজ করার অন্যতম কারণ ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পের সঙ্গে হাস্যরসের মিশ্রণ। তাঁর মতে, কঠিন বৈজ্ঞানিক কাহিনিকে সহজ করে তুলতে এই উপাদান গুরুত্বপূর্ণ।
সমালোচকেরা বলছেন, রায়ান গসলিং তাঁর স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ে এই চরিত্রকে একসঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত, হাস্যরসাত্মক ও আবেগপূর্ণ করে তুলেছেন।
ভিনগ্রহের প্রকৌশলীর সাথে বন্ধুত্ব

এ ছবির সবচেয়ে বড় চমক আসে ‘রকি’ চরিত্র। রকি ভিনগ্রহের একজন প্রকৌশলী। দেখতে অদ্ভুত, ভাষা সম্পূর্ণ অজানা, তবু লক্ষ্য একটাই-নিজেদের সভ্যতাকে বাঁচানো। রাইল্যান্ড ও রকির মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এক অসাধারণ বন্ধুত্ব। ভাষা, সংস্কৃতি, গ্রহ-সব বাধা পেরিয়ে তারা একে অপরকে বুঝতে শেখে। এ সম্পর্কই সিনেমার মূলকেন্দ্র হয়ে উঠে। সিনেমায় বিজ্ঞান প্রেক্ষাপট হলেও আসল গল্প বন্ধনের। জটিল বিজ্ঞানের এই জীবনযাপন হলেও মানুষের তথ প্রাণীদের আবেগের জায়গা অস্বীকার করা নেয়াত বোকামি।
এছাড়া, ছবিটি গভীর সংকটের মধ্যেও সহজ ও রসাত্মক। রাইল্যান্ডের সংলাপ, উদ্ভট পরিস্থিতি-সব মিলিয়ে অনেক মুহূর্তেই হাসি আসে। তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। যুদ্ধবিধ্বস্ত, জলবায়ু সংকট, হাজারো সংগ্রাম ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া আজকের এই পৃথিবীতে ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ এক ভিন্ন গল্প বলে। সিনেমাটি বলছে, একমাত্র প্রযুক্তিই শেষ কথা নয় কিংবা প্রযুক্তিই আমাদের একমাত্র রক্ষাকর্তা নয় বরং প্রযুক্তির পাশাপাশি পারস্পরিক সহমর্মিতা ও মানবিক বন্ধনই আমাদের সম্মিলিতভাবে বেঁচে থাকার উপায়। মানবজাতিকে ফিরতে হবে সহমর্মিতা ও মানবিকতার পথেই। তবেই পৃথিবী বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে।


