কয়েক ফোঁটা রক্তেই ধরা পড়বে শরীরের অসংখ্য রোগ, এমন এক বৈপ্লবিক প্রযুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করেছিলেন বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও। একসময় তাঁর প্রতিষ্ঠানের মূল্য দাঁড়িয়েছিল কয়েক শ কোটি ডলারে। কিন্তু যে প্রযুক্তি বদলে দেওয়ার কথা ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানকে, সেটিই হয়ে উঠল এক বিশাল প্রতারণার গল্প। তিনি এলিজাবেথ হোমস। আর তাঁর উত্থান, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পতনের সেই অবিশ্বাস্য কাহিনি নিয়েই নির্মিত হয়েছে তথ্যচিত্র ‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’।
বাস্তব জীবনের এই গল্পে আছে স্বপ্ন দেখানোর ক্ষমতা, ক্ষমতার মোহ, অর্থের ঝলকানি, প্রযুক্তির প্রতিশ্রুতি এবং বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার নির্মম পরিণতি। আশ্চর্যের বিষয়, এমন এক আলোচিত কাহিনি নিয়েই নির্মিত ছবিটি মুক্তির তৃতীয় সপ্তাহেও উত্তর আমেরিকার বক্স অফিসে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।
সিলিকন ভ্যালির বিস্ময় থেকে প্রতারণার অভিযোগ
এলিজাবেথ হোমসের গল্পের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। ১৯৮৪ সালে জন্ম নেওয়া এই মার্কিন উদ্যোক্তা মাত্র ১৯ বছর বয়সে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেরানোস (Theranos)। তাঁর লক্ষ্য ছিল রক্ত পরীক্ষার প্রচলিত পদ্ধতি বদলে দেওয়া।

সাধারণত রক্ত পরীক্ষার জন্য শরীর থেকে কয়েক মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু হোমস দাবি করেন, আঙুলের ডগা থেকে নেওয়া মাত্র কয়েক ফোঁটা রক্ত দিয়েই করা সম্ভব হবে অসংখ্য পরীক্ষা। এতে সময় ও খরচ দুটোই কমবে। চিকিৎসা পরীক্ষার সুবিধা পৌঁছে যাবে আরও বেশি মানুষের কাছে।
এই ধারণা তাঁকে দ্রুত আলোচনায় নিয়ে আসে। বিনিয়োগকারীরা তাঁর প্রতিষ্ঠানে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন। ২০১৪ সালের দিকে থেরানোসের মূল্যায়ন পৌঁছায় প্রায় ৯০০ কোটি ডলারে। হোমসও হয়ে ওঠেন সিলিকন ভ্যালির অন্যতম আলোচিত তরুণ উদ্যোক্তা। তাঁর কালো পোশাক, গভীর কণ্ঠস্বর এবং আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা তাঁকে অন্য উদ্যোক্তাদের চেয়ে আলাদা পরিচিতি দেয়।
কিন্তু সমস্যাটা ছিল প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে। থেরানোসের তৈরি যন্ত্র প্রত্যাশিতভাবে সব পরীক্ষা করতে পারছিল না। প্রতিষ্ঠানটি অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত পরীক্ষাগারের যন্ত্র ব্যবহার করত। অথচ বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রযুক্তির সক্ষমতা সম্পর্কে দেওয়া হয়েছিল ভিন্ন ধারণা। ২০১৫ সালে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব অসংগতি সামনে আসতে শুরু করে। এরপর একের পর এক তদন্তে থেরানোসের ব্যবসায়িক দাবিগুলো প্রশ্নের মুখে পড়ে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের পর হোমসের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে তাঁকে চারটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে জুরি। একই বছরের নভেম্বরে তাঁকে ১১ বছর ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা-সংক্রান্ত অভিযোগে তিনি খালাস পেয়েছিলেন।
কারাগারে যাওয়ার আগের ৩৪ দিন, ক্যামেরার সামনে হোমস
এলিজাবেথ হোমসের জীবনের এই বহুল আলোচিত অধ্যায় নিয়েই তৈরি হয়েছে ‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’। তবে এটি কেবল থেরানোসের উত্থান-পতনের ধারাবিবরণী নয়। বরং ছবিটির সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো, নির্মাতারা হোমসের জীবনের এমন এক সময়ে তাঁর কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, যখন তিনি কারাগারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

ছবির গল্প শুরু হয় কারাগারে আত্মসমর্পণের ৩৪ দিন আগে। হোমস নিজেই নির্মাতা নাথান ফিল্ডার ও ল্যান্স ওপেনহাইমকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ক্যামেরায় ধারণের আমন্ত্রণ জানান। নির্মাতারা তাঁর বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করেন। সেখানে হোমসের পাশাপাশি তাঁর সঙ্গী বিলি ইভান্স এবং তাঁদের সন্তানদের জীবনও উঠে আসে ক্যামেরায়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেন একজন দণ্ডিত উদ্যোক্তা নিজের জীবনের এত ব্যক্তিগত মুহূর্ত ক্যামেরার সামনে তুলে ধরতে চাইবেন? নিজের ভাবমূর্তি নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা, নাকি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ, কী ছিল সেই আমন্ত্রণের পেছনে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ছবিটি এগিয়ে যায়। নির্মাতারা শুধু হোমসের বক্তব্য ধারণ করেননি, তাঁর কথার সঙ্গে বাস্তবতার সম্পর্কও বোঝার চেষ্টা করেছেন। ফলে দর্শককে বারবার ভাবতে হয়, পর্দায় যা দেখছেন, সেটি কতটা সত্য, কতটা নিজের গল্প নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।
তিন বছরের গোপন চিত্রধারণ, বদলে যাওয়া গল্প
ছবিটির নির্মাণে যুক্ত হয়েছেন দুই ভিন্ন ধারার নির্মাতা। নাথান ফিল্ডার পরিচিত তাঁর ব্যতিক্রমী কমেডি ও রিয়েলিটি-ভিত্তিক নির্মাণের জন্য। তাঁর জনপ্রিয় কাজের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য রিহার্সাল’ ও ‘দ্য কার্স’। অন্যদিকে ল্যান্স ওপেনহাইম পরিচিত বাস্তব মানুষের জীবন ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য।
দুই নির্মাতা মিলে প্রায় চার বছর ধরে গোপনে ছবিটির কাজ করেছেন। শুধু হোমসের কারাগারে যাওয়ার আগের সময় নয়, তাঁর কারাজীবন শুরুর পরও গল্পের বিস্তার ঘটেছে। নির্মাতা নাথান ফিল্ডার হোমসের পরিবারের বাড়ির অতিথিশালায় অবস্থান করে তাঁদের জীবন ধারণ করেন। পরবর্তী সময়েও বিলি ইভান্সের সঙ্গে যোগাযোগ ও চিত্রধারণ অব্যাহত ছিল।


১৭৪ মিনিটের এই ছবিতে বাস্তব দৃশ্যের পাশাপাশি রয়েছে পুনর্নির্মিত কিছু মুহূর্ত এবং নির্মাতাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। ফলে প্রচলিত তথ্যচিত্রের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের মেটা-ডকুমেন্টারি। এখানে সত্য ও অভিনয়ের সীমারেখা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
ছবিটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয় ২০২৬ সালের টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসবে। পরে ৬৪তম নিউইয়র্ক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয় এটি। পরিবেশনার দায়িত্বে রয়েছে স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান এ২৪। ১৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ছবিটি।
সুপারহিরো সিনেমাকেও পেছনে ফেলল বাস্তবের গল্প
সাধারণত বড় বাজেটের সুপারহিরো কিংবা অ্যাকশন সিনেমা বক্স অফিসে এগিয়ে থাকে। কিন্তু ‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’ সেই ধারণায় ব্যতিক্রম তৈরি করেছে। মুক্তির তৃতীয় সপ্তাহেও উত্তর আমেরিকার বক্স অফিসে ছবিটি আলোচনার কেন্দ্রে। ৩ হাজার ২৪৩টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়ে সপ্তাহান্তে এর আয় দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ ডলার। এর মধ্য দিয়ে ডিসি কমিকসের চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘ক্লেফেস’কে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান ধরে রাখে ছবিটি। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই সীমিতসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহ থেকে প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ ডলার আয় করেছিল এটি।
আয়ের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ‘ক্লেফেস’। জেমস ওয়াটকিনস পরিচালিত হরর সিনেমাটিতে ব্যাটম্যানের পরিচিত খলনায়ক ম্যাট হেগেনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। মুখমণ্ডল ভয়াবহভাবে বিকৃত হয়ে যাওয়ার পর পরীক্ষামূলক চিকিৎসার আশ্রয় নেয় এক উঠতি চলচ্চিত্র তারকা। এরপরই শুরু হয় ভয়ংকর ঘটনা।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে লাইকার স্টপ-মোশন অ্যানিমেশন সিনেমা ‘ওয়াইল্ডউড’। ট্রাভিস নাইট পরিচালিত ছবিটির গল্প এক কিশোরীকে ঘিরে। তার ভাই অপহৃত হওয়ার পর এক সহপাঠীকে নিয়ে সে প্রবেশ করে রহস্যময় এক জাদুর বনে।
অস্কারের দৌড়েও আলোচনায়
বক্স অফিসের সাফল্যের পাশাপাশি পুরস্কারের মঞ্চেও জায়গা করে নিচ্ছে ‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’। ২০২৬ সালের সমালোচক নির্বাচিত তথ্যচিত্র পুরস্কার এবং গথাম অ্যাওয়ার্ডসে মনোনয়ন পেয়েছে ছবিটি। নাথান ফিল্ডার ও ল্যান্স ওপেনহাইমের পরিচালনা, চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনাও পেয়েছে স্বীকৃতি।

তবে ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়তো এর অদ্ভুত নির্মাণশৈলী। একজন দণ্ডিত উদ্যোক্তা নিজেই যখন নিজের জীবনের দরজা ক্যামেরার সামনে খুলে দেন, তখন সেই গল্প ধারণ করতে গিয়ে নির্মাতারাও জড়িয়ে পড়েন এক জটিল বাস্তবতায়।
এলিজাবেথ হোমস একসময় দাবি করেছিলেন, তাঁর প্রযুক্তি মানুষের জীবন বদলে দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের জীবনই হয়ে ওঠে প্রযুক্তি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রতারণার এক আলোচিত উদাহরণ।
‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’ সেই গল্পের আরেকটি অধ্যায়। এখানে শুধু একজন উদ্যোক্তার পতন দেখা নয়, বরং পর্দায় সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব, মানুষের বিশ্বাস এবং নিজের গল্প নিজেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টার মধ্যকার সংঘাতও সামনে আসে। আর সেই কারণেই ছবিটি দর্শকের কাছে নিছক একটি অপরাধের তথ্যচিত্রের চেয়ে অনেক বেশি কিছু হয়ে উঠেছে।









