Monday, November 2, 2026

জন্মদিনে ফিরে দেখা শাহরুখ খান – দিল্লির ছেলে থেকে বলিউডের ‘কিং’

রজনীকান্ত কেন সুপার স্টার ?

রজনীকান্ত কেন সুপার স্টার ? 

October 26, 2026

অমিতাভ বচ্চন – যে গল্প কখনো বলা হয়নি

October 16, 2026

আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা নায়িকা কে ?

October 12, 2026

সালমান শাহ কেন এত অল্প সময়ে কিংবদন্তি হয়ে গেলেন?

October 2, 2026

কেন অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যাওয়া ছেড়ে দিলেন আমির খান?

September 26, 2026

একসময় দিল্লির এক তরুণের স্বপ্ন ছিল অভিনেতা হওয়ার। হাতে ছিল না সিনেমার জগতে প্রবেশের কোনো নিশ্চিত পথ, ছিল না তারকাখ্যাতির নিশ্চয়তা। ব্যক্তিজীবনে একের পর এক কঠিন সময় পেরিয়ে সেই তরুণই একদিন হয়ে উঠলেন কোটি মানুষের প্রিয় তারকা। পর্দায় তাঁর রোমান্টিক হাসি, দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ানোর ভঙ্গি কিংবা সংলাপ বলার নিজস্ব ধরন সবই হয়ে উঠেছে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। তিনি শাহরুখ খান, ভক্তদের কাছে যিনি ‘কিং খান’, আবার কারও কাছে চিরকালের ‘কিং অব রোমান্স’।

২ নভেম্বর ১৯৬৫ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে জন্ম নেওয়া শাহরুখ খানের ৬১তম জন্মদিন ঘিরে তাই ফিরে দেখা যায়, এক সাধারণ তরুণের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প।

দিল্লির শৈশব, অভিনয়ের স্বপ্ন

শাহরুখ খানের বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ খান ছিলেন পেশোয়ারের মানুষ এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মা লতিফ ফাতিমা। বড় বোন শাহনাজ লালারুখের সঙ্গে দিল্লিতেই কেটেছে শাহরুখের শৈশব।

সেন্ট কলম্বাস স্কুলে পড়ার সময় পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও ভালো ছিলেন তিনি। স্কুলের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘সোর্ড অব অনার’ অর্জন করেছিলেন শাহরুখ। পরে হংসরাজ কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি নেন। তবে তাঁর আগ্রহ ছিল অভিনয়ে। দিল্লির থিয়েটার অ্যাকশন গ্রুপে (ট্যাগ) নাট্যনির্দেশক ব্যারি জনের অধীনে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

মাস কমিউনিকেশনে স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ভর্তি হলেও অভিনয়ের টানে শেষ পর্যন্ত সেই পড়াশোনা সম্পন্ন করেননি।

কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি শুরু হয় বাবা-মাকে হারানোর মধ্য দিয়ে। ১৯৮১ সালে ক্যানসারে বাবার মৃত্যু এবং ১৯৯১ সালে মায়ের প্রয়াণ তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। ব্যক্তিগত জীবনের এই শূন্যতা নিয়েই তিনি পা বাড়ান মুম্বাইয়ের দিকে। সামনে তখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, কিন্তু অভিনয়ের স্বপ্নে অবিচল এক তরুণ।

টেলিভিশন থেকে বড় পর্দায়

বড় পর্দায় পরিচিত হওয়ার আগে ছোট পর্দাতেই নিজের অভিনয়ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন শাহরুখ। ১৯৮৯ সালে প্রচারিত ‘ফৌজি’ ধারাবাহিকে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণরত এক তরুণের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের নজরে আসেন। পরে ‘সার্কাস’ ধারাবাহিকেও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়।

শাহরুখ খান

১৯৯২ সালে ‘দিওয়ানা’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে তাঁর। প্রথম ছবিতেই সাফল্য এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা নবাগত অভিনেতার স্বীকৃতি পান তিনি।

তবে শুরু থেকেই প্রচলিত নায়কের ছাঁচে নিজেকে আটকে রাখেননি শাহরুখ। ১৯৯৩ সালে ‘বাজিগর’ ও ‘ডর’ এর মতো সিনেমায় নেতিবাচক, আবেগপ্রবণ ও বিপজ্জনক চরিত্রে অভিনয় করে দর্শককে চমকে দেন। পর্দায় এমন চরিত্র বেছে নেওয়ার ঝুঁকিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। রোমান্টিক নায়ক হওয়ার আগেই তিনি প্রমাণ করেছিলেন, অভিনয়ের প্রয়োজনে নিজের জনপ্রিয় ভাবমূর্তির বিপরীতেও যেতে পারেন।

যে প্রেম তাঁকে কিংবদন্তি করেছে

১৯৯৫ সালে পরিচালক আদিত্য চোপড়ার ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ (ডিডিএলজে) শাহরুখের ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। রাজের চরিত্রে তাঁর অভিনয়, কাজলের সঙ্গে রসায়ন এবং ইউরোপের পটভূমিতে প্রেমের গল্প দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।

এরপর ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ (১৯৯৭), ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ (১৯৯৮), ‘কভি খুশি কভি গম’ (২০০১), ‘দেবদাস’ (২০০২), ‘কাল হো না হো’ (২০০৩) এবং ‘বীর-জারা’ (২০০৪) এর মতো সিনেমা তাঁকে রোমান্টিক নায়কের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০০৭ সালের ‘ওম শান্তি ওম’ সেই জনপ্রিয়তায় যোগ করে নতুন মাত্রা।

তবে শাহরুখের অভিনয়জীবন কেবল প্রেমের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। ‘স্বদেশ’ এ নাসার বিজ্ঞানী মোহন ভার্গবের চরিত্রে তিনি তুলে ধরেছেন নিজের শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা। ‘চাক দে! ইন্ডিয়া’তে নারী হকি দলের কোচ কবির খান এবং ‘মাই নেম ইজ খান’ এ রিজওয়ান খানের চরিত্রে দেখিয়েছেন অভিনয়ের ভিন্ন ভিন্ন দিক।

এই বৈচিত্র্যই তাঁকে শুধু বক্স অফিসের তারকা নয়, বরং দীর্ঘ ক্যারিয়ারের একজন আলোচিত অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

ভালোবাসা, পরিবার ও মান্নাত

পর্দার রোমান্টিক তারকার বাস্তব জীবনের প্রেমের গল্পও কম আলোচিত নয়। ১৯৯১ সালের ২৫ অক্টোবর কলেজজীবনের প্রেমিকা গৌরী ছিব্বরকে বিয়ে করেন শাহরুখ। গৌরী পরবর্তী সময়ে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ও চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে পরিচিতি পান।

এই দম্পতির তিন সন্তান; আরিয়ান, সুহানা ও আব্রাম। অভিনয় ও ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবার শাহরুখের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সমুদ্রের পাশে তাঁদের বাড়ি ‘মান্নাত’ আজ ভক্তদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। প্রিয় তারকাকে এক ঝলক দেখার আশায় প্রায়ই বাড়িটির বাইরে ভিড় করেন অনুরাগীরা।

আরিয়ানের নিজস্ব বিনোদন ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ রয়েছে। সুহানা অভিনয়জগতে পা রেখেছেন। অন্যদিকে, ছোট ছেলে আব্রামকে নিয়ে শাহরুখের পারিবারিক মুহূর্তগুলোও মাঝেমধ্যে ভক্তদের আলোচনায় আসে।

পর্দার বাইরেও এক সাম্রাজ্য

শাহরুখের সাফল্যের গল্প শুধু অভিনয়ে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্টের মাধ্যমে তিনি প্রযোজনা ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের জগতে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে আধুনিক ভিএফএক্স প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

২০০৮ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সহ-মালিক হওয়ার মধ্য দিয়ে ক্রিকেট ব্যবসাতেও যুক্ত হন তিনি। আইপিএলের এই দল একাধিকবার শিরোপা জিতেছে।

মানবিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত শাহরুখ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মীর ফাউন্ডেশন অ্যাসিড-সন্ত্রাস থেকে বেঁচে ফেরা নারীদের সহায়তা এবং নারী ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগে কাজ করে। এসব কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালে ইউনেসকোর পিরামিড কন মারনি পুরস্কার পান তিনি।

পুরস্কারের তালিকাতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য অর্জন। ২০০৫ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মশ্রী পান। ফ্রান্সের অর্দ্র দে আর্ত এ দে লেত্র (২০০৭) এবং লেজিওঁ দনর (২০১৪) সম্মাননাও পেয়েছেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের পাশাপাশি ২০২৫ সালে ‘জওয়ান’ সিনেমার জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি অর্জন করেন।

বিরতি পেরিয়ে প্রত্যাবর্তন

২০১০ দশকে ‘রা.ওয়ান’, ‘ফ্যান’ ও ‘জিরো’ এর মতো ভিন্নধর্মী সিনেমায় অভিনয় করেছেন শাহরুখ। ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ এর মতো বাণিজ্যিক সাফল্যও পেয়েছেন। তবে কয়েকটি সিনেমা প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় ২০১৮ সালের ‘জিরো’ এর পর দীর্ঘ সময় তাঁকে বড় পর্দায় দেখা যায়নি।

চার বছরের বিরতির পর ২০২৩ সালে যেন নতুন রূপে ফিরে আসেন তিনি। ‘পাঠান’, ‘জওয়ান’ ও ‘ডানকি’ একই বছরে মুক্তি পাওয়া তিন সিনেমার মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন এই অভিনেতা। বিশেষ করে ‘পাঠান’ ও ‘জওয়ান’ এর অ্যাকশনধর্মী চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে, বয়স বাড়লেও দর্শককে নতুনভাবে চমকে দেওয়ার ক্ষমতা হারাননি তিনি।

২০২৬: নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষা

৬১তম জন্মদিনে শাহরুখের সামনে রয়েছে আরেকটি বড় প্রত্যাশা সিনেমা ‘কিং’। সিদ্ধার্থ আনন্দ পরিচালিত সিনেমাটি ২০২৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির জন্য নির্ধারিত। ছবিতে শাহরুখের সঙ্গে অভিনয় করছেন তাঁর মেয়ে সুহানা খান। বাবা-মেয়ের এই প্রথম পর্দা ভাগাভাগি ছবিটিকে ঘিরে দর্শকের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে।

ছবিটির নতুন পোস্টার প্রকাশের পর শাহরুখ আবারও আলোচনায় এসেছেন। তবে সিনেমাটি মুক্তির আগে এর বাণিজ্যিক সাফল্য নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। দর্শকের প্রত্যাশা, ছবির নির্মাণ এবং মুক্তির পর বক্স অফিসের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ‘কিং’এর অবস্থান।

দিল্লির থিয়েটারকর্মী থেকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত তারকা শাহরুখ খানের যাত্রায় সাফল্য যেমন আছে, তেমনি রয়েছে ব্যক্তিগত শোক, ব্যর্থতা, বিরতি এবং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প। তাঁর ক্যারিয়ার দেখিয়েছে, জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে শুধু পরিচিত মুখ হয়ে থাকাই যথেষ্ট নয়; সময়ের সঙ্গে নিজেকেও বদলাতে হয়।

তাই শাহরুখ খানকে ঘিরে জন্মদিনের উদ্‌যাপন কেবল একজন অভিনেতার বয়স বাড়ার উপলক্ষ নয়। এটি এমন এক যাত্রার দিকে ফিরে তাকানোর দিন, যেখানে স্বপ্ন, অধ্যবসায়, অভিনয় আর দর্শকের ভালোবাসা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য পরিচয় বলিউডের ‘কিং খান’।

Share

Read more

Local News