‘ব্রেকিং ব্যাড’ এর ওয়াল্টার জুনিয়র চরিত্রে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অভিনয়ের বাইরেও প্রতিবন্ধিতা নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলানো এবং সবার জন্য সমান সুযোগের পক্ষে কথা বলার মধ্য দিয়ে আলাদা পরিচয় গড়েছিলেন আরজে মেটি।
কিছু অভিনেতাকে আমরা মনে রাখি তাঁদের অভিনীত চরিত্রের জন্য। আবার কেউ কেউ আছেন, যাঁদের নিজেদের জীবনও হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার গল্প। আরজে মেটি ছিলেন তেমনই একজন।
জনপ্রিয় মার্কিন টিভি সিরিজ ‘ব্রেকিং ব্যাড’এ ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। তবে তাঁর পরিচয় শুধু এই চরিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজের অভিজ্ঞতা ও কাজের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা মানুষের স্বপ্ন, প্রতিভা কিংবা সম্ভাবনার শেষ কথা নয়।
২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর, ৩৪ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিলে তাঁর মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে ভক্ত ও সহকর্মীদের মধ্যে শোক ছড়িয়ে পড়ে। অল্প বয়সে থেমে যাওয়া তাঁর জীবনের গল্প আজ মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষ তাঁর কাজের বাইরেও কতটা প্রভাব রাখতে পারেন।
শৈশবের চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে
বিশ্বজুড়ে অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আগে, আরজে মেটি ছিলেন মিসিসিপির জ্যাকসনে জন্ম নেওয়া এক শিশু। ১৯৯২ সালের ২১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন তিনি। রয় ফ্র্যাঙ্ক মেটি জুনিয়র ও ডায়না মেটি তাঁকে দত্তক নেন। তিন বছর বয়সে তাঁর সেরিব্রাল পালসি ধরা পড়ে। এই শারীরিক অবস্থা মানুষের চলাফেরা, ভারসাম্য ও পেশির নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। ছোটবেলায় তাঁকে পায়ে ব্রেস পরতে হতো এবং নিয়মিত শারীরিক থেরাপি নিতে হতো।
এক পর্যায়ে তাঁর পরিবারেও নেমে আসে কঠিন সময়। কিশোর বয়সে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর মা চলাফেরার ক্ষমতা হারান। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে অল্প বয়সেই নানা দায়িত্ব নিতে হয় মেটিকে। জীবিকার প্রয়োজনে ছোটখাটো কাজও করেছেন তিনি।
২০০৬ সালে তাঁর ছোট বোন অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ায় পরিবার লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে যায়। সেখানে অভিনয়ের ক্লাসে ভর্তি হন মেটি । শুরুতে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নতুন বন্ধু তৈরি করা। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই পরে তাঁকে নিয়ে যায় টেলিভিশনের অন্যতম জনপ্রিয় সিরিজের জগতে।

যে চরিত্র বদলে দিল জীবন
২০০৮ সালে ‘ব্রেকিং ব্যাড’এ অভিনয়ের সুযোগ পান মেটি। সিরিজে তাঁর চরিত্র ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র, পরিবারের প্রতি যত্নশীল এক তরুণ। তার বাবা ওয়াল্টার হোয়াইট, অভিনয়ে ব্রায়ান ক্র্যানস্টন, ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে মাদক তৈরির অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। তাঁর সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।
এই অস্থিরতার মধ্যে ওয়াল্টার জুনিয়র ছিল পরিবারের একজন সাধারণ সদস্য। সে বাবাকে ভালোবাসে, তাঁর আচরণ বোঝার চেষ্টা করে এবং চারপাশের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে চায়।
চরিত্রটির সঙ্গে মেটির জীবনের একটি মিল ছিল, সেরিব্রাল পালসি। তবে বাস্তব জীবনে মেটির ওপর এর প্রভাব তাঁর অভিনীত চরিত্রটির তুলনায় কম ছিল। চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি নিজের চলাফেরা ও কথা বলার ধরনে পরিবর্তন আনেন।
২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রচারিত সিরিজটির পাঁচটি সিজনেই অভিনয় করেন তিনি। সময়ের সঙ্গে ‘ব্রেকিং ব্যাড’ টেলিভিশনের অন্যতম প্রশংসিত সিরিজে পরিণত হয়। ২০১৪ সালে সিরিজটির অন্য অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে ড্রামা সিরিজে সেরা দলীয় অভিনয়ের জন্য স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ড পান মেটি।
এই চরিত্র তাঁকে পরিচিতি দিলেও তাঁর অভিনয়ের গুরুত্ব ছিল আরও গভীরে। পর্দায় প্রতিবন্ধী একজন তরুণকে পরিবারের স্বাভাবিক সদস্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি; যারও রয়েছে ভালোবাসা, রাগ, ভয়, স্বপ্ন ও নিজস্ব মতামত।
পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে
জনপ্রিয় চরিত্রের কারণে অনেক সময় অভিনেতারা একটি পরিচয়ের মধ্যেই আটকে যান। মেটির ক্ষেত্রেও ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র হয়ে ওঠে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরিচিত চরিত্র। কিন্তু তিনি শুধু এই পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি।
‘ব্রেকিং ব্যাড’ শেষ হওয়ার পরও টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে কাজ চালিয়ে যান তিনি। ‘সুইচড অ্যাট বার্থ’, ‘দ্য গার্ডিয়ানস অব জাস্টিস’, ‘দ্য ওক রুম’ এবং ‘দ্য রিকল’এর মতো কাজেও দেখা গেছে তাঁকে।
২০২৬ সালে ‘টকিং টু স্ট্রেঞ্জার্স’ নামের একটি রোমান্টিক ড্রামাতেও কাজ করছিলেন তিনি। এতে জশুয়া নামের সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত এক চরিত্রে অভিনয় করেন মেটি । নতুন চরিত্রের মাধ্যমে নিজের অভিনয় জীবন এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি।
অভিনয়ের বাইরেও ছিল লড়াই
মেটি জানতেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ পাওয়ার আগেই অন্যের বিচার-বিশ্লেষণের মুখে পড়েন। বিনোদনজগতে তাঁদের জন্য সুযোগ সীমিত থাকাও ছিল বড় বাধা।
নিজের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে এই পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করেন তিনি। ইউনাইটেড সেরিব্রাল পালসি ও শ্রাইনার্স চিলড্রেনসের সঙ্গে দূত হিসেবে কাজ করে প্রতিবন্ধিতা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখেন। মেটি ফাউন্ডেশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

তাঁর কাজের বার্তা ছিল স্পষ্ট। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু তাঁদের শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়। তাঁদেরও সমান সুযোগ, সম্মান এবং নিজের পরিচয় নিজের মতো করে গড়ে তোলার অধিকার রয়েছে।
পর্দায় প্রতিবন্ধী চরিত্র দেখানোই শুধু প্রতিনিধিত্বের বিষয় নয়; তাঁদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে তুলে ধরাও জরুরি। তাঁদেরও স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়া, সম্পর্ক, ভুল, আনন্দ ও কষ্ট আছে। মেটির অভিনয় এই বিষয়টি দর্শকের সামনে তুলে ধরতে সাহায্য করেছে।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে নতুন স্বপ্ন
ব্যক্তিগত জীবনেও সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মেটি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দীর্ঘদিনের সঙ্গী কেনেডি সুয়ারেজকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তিনি। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বেভারলি হিলসে ‘টকিং টু স্ট্রেঞ্জার্স’ ছবির প্রদর্শনীতে অংশ নেন। ৪ অক্টোবর ‘ব্রেকিং ব্যাড’এর সহ-অভিনেতা লুইস মনকাদার সঙ্গে আলবুকার্ক আন্তর্জাতিক বেলুন উৎসবেও দেখা যায় তাঁকে।
এসব উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তিনি নিজের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর প্রতিনিধিরা তাঁকে অভিনেতা, সমাজসেবক এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন।
সিরিজে তাঁর বাবার চরিত্রে অভিনয় করা ব্রায়ান ক্র্যানস্টন এবং সহ-অভিনেতা অ্যারন পলও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মেটিকে হারানো শুধু একজন সহ-অভিনেতাকে হারানো নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের এক সম্পর্কের বিচ্ছেদ। আরজে মেটি আজ নেই, কিন্তু তাঁর অভিনয় ও প্রচেষ্টা থেকে যাবে। তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেবে একজন মানুষকে তাঁর সীমাবদ্ধতা দিয়ে নয়, বরং তাঁর স্বপ্ন, কাজ ও অবদান দিয়ে মনে রাখা উচিত।









