Tuesday, October 6, 2026

দৃশ্যম ৩- শেষ খেলায়ও কি বিজয়ের জয়?

সালমান শাহ কেন এত অল্প সময়ে কিংবদন্তি হয়ে গেলেন?

October 2, 2026

কেন অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যাওয়া ছেড়ে দিলেন আমির খান?

September 26, 2026

সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোর অবিশ্বাস্য গল্প 

September 17, 2026

শত শত কোটি বাজেট, তবুও ভয়াবহ ফ্লপ!

September 10, 2026

শাকিব খানের উত্থানের গল্প

September 6, 2026

একটা তারিখ, কয়েকটি সিনেমা আর এক পরিবারের বাঁচার লড়াই ‘দৃশ্যম’ সিরিজের শুরু থেকেই এই তিনটি বিষয় যেন এক সুতোয় বাঁধা। এবার সেই গল্পের শেষ অধ্যায়ও শুরু হয়েছে সেই একই তারিখে। ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর দিনে প্রেক্ষাগৃহে এসেছে ‘দৃশ্যম: দ্য কনক্লুশন’। অজয় দেবগন আবারও ফিরেছেন বিজয় সালগাঁওকর হয়ে। তবে এবার তার সামনে শুধু পুলিশ নয়, পুরোনো ঘটনার নতুন হিসাবও।

মুক্তির পর তিন দিনেই ছবিটি ভারতের বাজারে প্রায় ১৭৬ কোটি রুপি নেট আয় করেছে। বিশ্বব্যাপী আয় ছাড়িয়েছে ২৭০ কোটি রুপি। একই সঙ্গে এটি অজয় দেবগনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ওপেনিং দেওয়া ছবিও হয়েছে।

দৃশ্যম ৩-শেষ খেলায়ও কি বিজয়ের জয়

প্রথম গল্প থেকে আজকের দৃশ্যম

২০১৫ সালে ‘দৃশ্যম’ দিয়ে শুরু হয়েছিল বিজয় সালগাঁওকরের গল্প। তখন তিনি ছিলেন একজন সাধারণ কেবল ব্যবসায়ী। কিন্তু পরিবারের ওপর বিপদ নেমে আসার পর তিনি এমন এক পরিকল্পনা করেন যা সিনেমার গল্প, তারিখ, সময় ও মানুষের স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে প্রমাণ করা হয়, ঘটনার সময় বিজয় অন্য জায়গায় ছিলেন।

প্রথম ছবিটি ছিল ২০১৩ সালের মালয়ালম ছবি ‘দৃশ্যম’ এর হিন্দি রিমেক। মূল ছবিতে মোহনলাল অভিনয় করেছিলেন। হিন্দি ছবিতে সেই চরিত্রে আসেন অজয় দেবগন। ২০১৫ সালের ছবিটি শুরুতে খুব বড় ওপেনিং না পেলেও ধীরে ধীরে দর্শকের পছন্দের ছবি হয়ে ওঠে। ভারতে এর মোট আয় ছিল প্রায় ৬৭ কোটি রুপি।

এরপর ২০২২ সালে আসে ‘দৃশ্যম ২’। এবার গল্পে পুরোনো ঘটনা আবার সামনে আসে। পুলিশের তদন্ত, আদালত এবং বিজয়ের তৈরি করা পরিকল্পনা নিয়ে আরও বড় খেলা শুরু হয়। ‘দৃশ্যম ২’ ভারতের বক্স অফিসে প্রায় ২৪০.৫৪ কোটি রুপি আয় করে। ফলে প্রথম ছবির তুলনায় সিরিজটির জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছিল, তা  তখনই পরিষ্কার হয়ে যায়।

দৃশ্যম ৩-শেষ খেলায়ও কি বিজয়ের জয়

‘দৃশ্যম ৩’এ বিজয় ও তার পরিবার আবারও পুরোনো ঘটনার ছায়ায় পড়ে। আগের দুই ছবিতে যে ঘটনা থেকে সবকিছুর শুরু, সেটিই এবার নতুন করে প্রশ্নের সামনে আসে। সমীর দেশমুখের মৃত্যুর ঘটনা আবার তদন্তের কেন্দ্রে চলে আসে। বিজয়ের সামনে এবার নতুন এক পুলিশ কর্মকর্তা রাজবীর সিং তোমর। চরিত্রটি করেছেন জয়দীপ আহলাওয়াত।

অন্যদিকে তাবু আবারও মীরা দেশমুখের চরিত্রে ফিরেছেন। তবে এবার তার চরিত্রের অবস্থানেও পরিবর্তন দেখা যায়। পুরোনো তদন্তের পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বিষয়টি গল্পে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, এবার প্রশ্ন শুধু ‘বিজয় কীভাবে পরিবারকে বাঁচাবে? এতটুকু নয়। প্রশ্ন হলো, আগের সব চালের পর বিজয়ের হাতে কি আর কোনো চাল বাকি আছে?

নতুন মুখেই বড় পরিবর্তন

এই ছবির সবচেয়ে আলোচিত নতুন সংযোজন জয়দীপ আহলাওয়াত ও প্রকাশ রাজ। জয়দীপ অভিনয় করেছেন রাজবীর সিং তোমর নামের এক পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে। আর প্রকাশ রাজের চরিত্র ইন্দ্রজিৎ শেট্টি গল্পে আদালতের লড়াইকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। অজয় দেবগন, তাবু ও শ্রিয়া সরনের সঙ্গে এই দুই অভিনেতার উপস্থিতি ছবির সংঘাতকে আগের দুই পর্বের চেয়ে বড় করেছে। ছবিতে আরও আছেন ইশিতা দত্ত, রাজত কাপুর, মৃণাল যাদব, সৌরভ শুক্লা ও কমলেশ সাওয়ান্ত।

দৃশ্যম ৩-শেষ খেলায়ও কি বিজয়ের জয়

এখানেই ‘দৃশ্যম ৩’ আগের দুই ছবির থেকে আলাদা। প্রথম দুটি হিন্দি ছবি ছিল মালয়ালম ‘দৃশ্যম’ সিরিজের গল্পের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কিন্তু দৃশ্যম দ্য কনক্লুশন’এর হিন্দি সংস্করণে নতুন গল্প ও নতুন চিত্রনাট্য ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, মোহনলালের মালয়ালম ‘দৃশ্যম ৩’এর গল্প হুবহু অনুসরণ করেনি অজয় দেবগনের ছবিটি। নির্মাতারা হিন্দি দর্শকের জন্য আলাদা গল্প তৈরি করেছেন। এই সিদ্ধান্তই ছবিটিকে ঘিরে আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে। কারণ আগের দুই ছবির দর্শকরাও জানতেন না, শেষ পর্যন্ত বিজয় সালগাঁওকরের গল্প কোন দিকে যাবে।

ছবিটি পরিচালনা করেছেন অভিষেক পাঠক। তিনি ‘দৃশ্যম ২’এরও পরিচালক ছিলেন। এবার গল্প, চিত্রনাট্য ও চরিত্র গুলোকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে এসেছেন। চিত্রনাট্যে অভিষেক পাঠকের সঙ্গে আছেন আমিল কিয়ান খান ও পারভেজ শেখ। সংলাপ লিখেছেন আমিল কিয়ান খান।

নির্মাণে রয়েছে প্যানোরামা স্টুডিওস ও স্টার স্টুডিও ১৮। প্রযোজক হিসেবে আছেন কুমার মঙ্গত পাঠক, অভিষেক পাঠক, অজিত আন্ধারে ও অলোক জৈন। সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন সুধীর কে. চৌধুরী। সম্পাদনায় স্যান্ডি ফ্রান্সিস। সংগীতে রবি বসরুর, রোচক কোহলি ও কার্মা। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর করেছেন অমর মহিলে।

অজয়ের ক্যারিয়ারে নতুন রেকর্ড

ছবিটি মুক্তির প্রথম দিনেই অজয় দেবগনের জন্য বড় রেকর্ড তৈরি করে। প্রাথমিক ট্রেড রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে প্রথম দিনে ছবিটির নেট আয় প্রায় ৬২ থেকে ৬৬.৭৫ কোটি রুপি। হিসাবের উৎসভেদে সংখ্যায় কিছু পার্থক্য আছে। তবে বিশ্বব্যাপী প্রথম দিনের আয় প্রায় ৯৫.১০ কোটি রুপি, এ বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদনে একই তথ্য এসেছে। এটি অজয় দেবগনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ওপেনিং। এর আগে তার রেকর্ড ছিল ‘সিংহাম এগেইন’ এর।

তিন দিনে ছবিটির ভারতের নেট আয় প্রায় ১৭৬.৫০ কোটি রুপি এবং বিশ্বব্যাপী আয় প্রায় ২৭২.৮০ কোটি রুপি বলে ট্রেড রিপোর্টে জানানো হয়েছে। ২০২৬ সালের হিন্দি সিনেমার ওপেনিং সপ্তাহেও ছবিটি ‘ধুরন্ধর ২: দ্য রিভেঞ্জ’এর পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বলে রিপোর্ট এসেছে। আগের দুই ছবিকে অনেক পেছনে ফেলেছে। তুলনাটা আরও পরিষ্কার হয় আগের দুই ছবির সঙ্গে হিসাব করলে, দেখা যাবে-

দৃশ্যম ৩-শেষ খেলায়ও কি বিজয়ের জয়?

‘দৃশ্যম’ ২০১৫ সালে ভারতে প্রায় ৬৭ কোটি রুপি আয় করেছিল। ‘দৃশ্যম ২’ ২০২২ সালে গিয়ে সেই আয়কে কয়েক গুণ বাড়িয়ে প্রায় ২৪০.৫৪ কোটি রুপি করে। আর ‘দৃশ্যম ৩’ মুক্তির মাত্র তিন দিনেই ভারতের নেট আয় প্রায় ১৭৬.৫০ কোটি রুপিতে পৌঁছে গেছে।

এখন সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে শেষ পর্যন্ত ছবিটি কি ৩০০ কোটি, নাকি তারও বেশি আয় করবে? শুধু ভারতে নয়, বিদেশেও বড় মুক্তি। ‘দৃশ্যম ৩’কে শুধু ভারতীয় দর্শকের জন্য রাখা হয়নি।

মুক্তির আগে ছবিটি ৬০টি দেশে প্রায় ১,৩০০ বিদেশি পর্দায় মুক্তির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আগাম টিকিট বিক্রিতেও বড় সাড়া দেখা যায়। মুক্তির আগে প্রায় ১১ লাখ টিকিট বিক্রি হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ, বিজয় সালগাঁওকরের শেষ গল্পটি ভারতীয় দর্শকের পাশাপাশি বিদেশে থাকা ভারতীয় ও দক্ষিণ এশীয় দর্শকের কাছেও পৌঁছে গেছে।

মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিটি নিয়ে বেশির ভাগ প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক। বিশেষ করে তিনটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে। অজয় দেবগনের অভিনয়, জয়দীপ আহলাওয়াতের উপস্থিতি এবং সিনেমার ক্লাইম্যাক্স।

দর্শকদের অনেকে বলেছেন, ছবির টানটান পরিবেশ এবং শেষের মোড় তাদের আগের দুই ছবির কথা মনে করিয়েছে। কেউ কেউ আবার নতুন ছবির ক্লাইম্যাক্সকে প্রথম দুই ছবির থেকেও শক্তিশালী বলে মন্তব্য করেছেন।

সবচেয়ে মজার প্রতিক্রিয়া এসেছে মালয়ালম দর্শকদের একটি অংশের কাছ থেকে। মূল মালয়ালম ‘দৃশ্যম’ সিরিজের দর্শকদের অনেকে হিন্দি সংস্করণের নতুন গল্প ও চিত্রনাট্যের প্রশংসা করেছেন। এমনকি কেউ কেউ এটিকে মোহনলাল অভিনীত সংস্করণের চেয়েও ভালো বলে মন্তব্য করেছেন।

বক্স অফিসের ঝড়

ছবিটির জনপ্রিয়তা শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইনের বাইরে প্রভাবও চোখে পড়ছে। প্রথম সপ্তাহেই বড় বক্স অফিস সাড়া পাওয়ার পর এর প্রভাব পড়েছে অন্য ছবির মুক্তির পরিকল্পনাতেও। অজয় দেবগনের ছবির শক্ত অবস্থানের কারণে আয়ুষ্মান খুরানা ও সারা আলি খানের ‘উড়তা তীর’ এর মুক্তি পিছিয়ে দেওয়ার খবর এসেছে। এটি দেখাচ্ছে, ‘দৃশ্যম ৩’ শুধু একটি নতুন ছবি হিসেবে নয়, বড় একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে বাজারে প্রভাব ফেলছে।

এই সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এর নায়ক নয়, বুদ্ধির খেলা। এখানে বিশাল অ্যাকশন নেই। নেই সুপার হিরো। আছে একটি সাধারণ পরিবার, পুলিশের সন্দেহ, একটি পুরোনো ঘটনা এবং এমন একজন মানুষ, যে সিনেমা দেখে শেখা জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজের পরিবারের জন্য অসম্ভব এক পরিকল্পনা তৈরি করে।

তাই দর্শক শুধু বিজয়ের পক্ষে দাঁড়ান না। তারা তার পরিকল্পনাও অনুসরণ করেন। ‘দৃশ্যম ৩’ সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই শেষবারের মতো সামনে আনে, বিজয় সালগাঁওকর কি সত্যিই পুলিশের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে পারবে? নাকি এবার তার তৈরি করা সব গল্প, সব তারিখ আর সব হিসাব একসঙ্গে ভেঙে যাবে? এটাই ‘দৃশ্যম: দ্য কনক্লুশন’এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। কারণ এবার শুধু একটি মামলার সমাধান নয়। শেষবারের মতো পর্দায় চলছে বিজয় সালগাঁওকর বনাম সত্যের লড়াই।

Share

Read more

Local News