ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে আলোচনার ঝড় তোলা মার্টিন ম্যাকডোনার নতুন সিনেমা ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে। দুই সিআইএ কর্মকর্তার এক রহস্যময় মিশন, ১৯৭৩ সালের চিলির রাজনৈতিক অস্থিরতা, ইস্টার আইল্যান্ডের বিচ্ছিন্ন পরিবেশ এবং অতীতের অপরাধবোধ, সবকিছু মিলিয়ে সিনেমাটি হয়ে উঠেছে এক অন্ধকার, জটিল ও গভীর রাজনৈতিক গল্প।
একটি দ্বীপ। চারদিকে শুধু সমুদ্র। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল মোয়াই মূর্তি। আর সেই নির্জনতার মাঝে লুকিয়ে থাকা এমন এক মিশন, যার সত্যিকারের উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। এমনই এক রহস্যময় গল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন বিশ্বখ্যাত নির্মাতা মার্টিন ম্যাকডোনা। তাঁর নতুন সিনেমা ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ শুধু গুপ্তচরবৃত্তির গল্প নয়, বরং এটি মানুষের বিবেক, অতীতের ভুল, ক্ষমতার রাজনীতি এবং নিজের করা কাজের মুখোমুখি হওয়ার এক কঠিন যাত্রা।
রহস্যময় অভিযান
সিনেমার গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন দুই দীর্ঘদিনের সিআইএ কর্মকর্তা ক্রিস ও লি। ক্রিস চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা John Malkovich এবং লির চরিত্রে রয়েছেন Sam Rockwell। ১৯৭৩ সালের চিলির সামরিক অভ্যুত্থানের ঠিক আগের উত্তাল সময়ে তাদের একটি বিশেষ মিশনে পাঠানো হয়। সান্তিয়াগো থেকে তাদের গন্তব্য, বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ইস্টার আইল্যান্ড।

প্রথমে এই অভিযান সাধারণ একটি গোপন দায়িত্ব বলেই মনে হয়। কিন্তু দ্বীপে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। চারপাশের নীরবতা, অতীতের ইতিহাস এবং তাদের নিজেদের গোপন কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে। দুই সহকর্মী বুঝতে পারেন, তারা শুধু একটি মিশন সম্পন্ন করতে আসেননি; বরং তাদের নিজেদের অতীতের সঙ্গেও লড়াই করতে হবে।
ইস্টার আইল্যান্ডের রহস্য
ইস্টার আইল্যান্ড পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় স্থান। বিশাল পাথরের মূর্তি, বিচ্ছিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান এবং হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার গল্প এই দ্বীপকে ঘিরে তৈরি করেছে আলাদা এক আকর্ষণ। ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’-এ এই দ্বীপ শুধু একটি লোকেশন নয়, বরং গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে।
দ্বীপের নীরব পরিবেশের মধ্যে ক্রিস ও লির সম্পর্কেও ফাটল দেখা দিতে শুরু করে। বহু বছরের বন্ধুত্ব ও পেশাগত সম্পর্কের আড়ালে থাকা প্রশ্ন গুলো সামনে আসে। তাদের অতীতের সিদ্ধান্ত, গোপন অভিযান এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব সিনেমার গল্পকে আরও গভীর করে তোলে।
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র
সিনেমার পটভূমি ১৯৭৩ সালের চিলি। সেই সময় দেশটি ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সামরিক অভ্যুত্থানের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এই বাস্তব ইতিহাসের আবহকে ব্যবহার করে ম্যাকডোনা তৈরি করেছেন এমন একটি গল্প, যেখানে বড় রাজনৈতিক ঘটনা গুলোর পাশাপাশি উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের মানসিক লড়াই।

মিশনের মাঝেই ক্রিসের সঙ্গে দুই বিদ্রোহী শিক্ষার্থীর সম্পর্ক তৈরি হয়। তাদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন চিলির অভিনেত্রী মারিয়ানা দি জিরোলামো ও আইলিন সালাস। এই সম্পর্ক পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার জন্য ব্যক্তিগত অনুভূতি ও পেশাগত দায়িত্বের সংঘর্ষ কখনোই সহজ নয়।
অতীতের ভুল
‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’-এর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটাই, অতীতের কাজের দায় থেকে কি মানুষ কখনো মুক্তি পেতে পারে? ক্রিস ও লির চরিত্রের মাধ্যমে সিনেমাটি দেখায়, ক্ষমতার জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় বছরের পর বছর একজন মানুষের ভেতরে অপরাধবোধ তৈরি করে। তারা যে কাজগুলো একসময় দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিলেন, সময়ের সঙ্গে সেগুলোই তাদের কাছে প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে।
ম্যাকডোনা এখানে শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস দেখাননি, তিনি দেখিয়েছেন মানুষের ভেতরের যুদ্ধ। একজন ব্যক্তি যখন বুঝতে পারেন তার সিদ্ধান্তের প্রভাব অন্য মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে, তখন সেই উপলব্ধি কতটা কঠিন হতে পারে, সিনেমাটি সেই জায়গাতেই আঘাত করে।
মার্টিন ম্যাকডোনার ডার্ক হিউমারের স্বাদ
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, গুপ্তচরবৃত্তি ও অপরাধবোধের মতো ভারী বিষয় থাকলেও ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ পুরোপুরি গম্ভীর সিনেমা নয়। মার্টিন ম্যাকডোনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অন্ধকার বিষয়কে তীক্ষ্ণ হাস্যরস ও ব্যতিক্রমী সংলাপের মাধ্যমে তুলে ধরা।
‘থ্রি বিলবোর্ডস আউটসাইড এবিং, মিসৌরি’ এবং ‘দ্য বানশিজ অব ইনিশেরিন’ এর মতো সিনেমায় তিনি যেভাবে মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছেন, এখানেও সেই পরিচিত ধরন দেখা গেছে। চরিত্র গুলোর কথোপকথন, অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেও তৈরি হওয়া হাস্যরস এবং মানুষের দুর্বলতাকে দেখানোর ধরন সিনেমাটিকে আলাদা করেছে।
তারকায় ভরা অভিনয়শিল্পী
‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ এ অভিনয় করেছেন একাধিক জনপ্রিয় অভিনেতা। জন ম্যালকোভিচ, স্যাম রকওয়েল ও স্টিভ বুসেমির পাশাপাশি রয়েছেন মারিয়ানা দি জিরোলামো, আইলিন সালাস, টম ওয়েটস এবং পার্কার পোসি।

বিশেষ করে ক্রিস চরিত্রে জন ম্যালকোভিচের অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব, অপরাধবোধ এবং মানসিক চাপ তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়াইল্ড হর্স নাইন
‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নেয়। ৩ সেপ্টেম্বর ভেনিসে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি আসে জন ম্যালকোভিচের জন্য। ক্রিস চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সেরা অভিনেতার ভলপি কাপ পুরস্কার অর্জন করেন।
কেন আলোচনায় ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’?
কারণ এই সিনেমা শুধু একটি গুপ্তচর কাহিনি নয়। এটি এমন একটি গল্প যেখানে :
- রাজনৈতিক ক্ষমতার পেছনের অন্ধকার দিক উঠে এসেছে
- গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের নৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে
- বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসের সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছে
- অতীতের ভুলের সঙ্গে মানুষের লড়াই দেখানো হয়েছে
ইস্টার আইল্যান্ডের রহস্যময় পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ আসলে মানুষের ভেতরের অন্ধকার দিকের গল্প বলে। মার্টিন ম্যাকডোনা আবারও প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু গল্প বলেন না, তিনি মানুষের বিবেকের সামনে আয়না ধরেন। রাজনীতি, গুপ্তচরবৃত্তি আর ব্যক্তিগত অনুশোচনার এই অন্ধকার যাত্রা ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ কে ২০২৬ সালের অন্যতম আলোচিত সিনেমায় পরিণত করেছে।









