বয়স কত হলো জাহিদ ভাই? প্রশ্নের উত্তরে জাহিদ হাসান বলেন, ৬০। সংখ্যাটা বলতে যতটা সহজ, নিজের বয়স ৬০ হয়েছে বিষয়টি যেন এখনো ততটাই অবিশ্বাস্য এই অভিনেতার কাছে। আজ ৪ অক্টোবর ৬০ বছরে পা রাখছেন মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী জাহিদ হাসান। ছয় দশকের পথচলায় পেয়েছেন দর্শকের ভালোবাসা ও জনপ্রিয়তা। তবে এই বিশেষ দিনে পেছন ফিরে তাকিয়ে সাফল্যের পাশাপাশি জীবনের ভুল, অনুতাপ আর মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
পরিবারের সব ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট জাহিদ হাসান। বয়স বাড়লেও পরিবারের কাছে সেই ছোটই রয়ে গেছেন। তাই ৬০ বছরে পা দেওয়ার বিষয়টি এখনো তাঁর কাছে কিছুটা অবিশ্বাস্য। জাহিদ বলেন, অনেকের কাছে তিনি বড় হলেও পরিবারের সবার ছোট হওয়ায় আজীবনই সবার কাছে ছোট হয়ে আছেন।

জীবনের এই পর্যায়ে এসে নিজের ভুলের কথাও অকপটে স্বীকার করছেন জাহিদ। তাঁর ভাষায়, জীবনে অনেক ভুল করেছি। মানুষ ভুল করবে, সেটাই স্বাভাবিক। আমিও মানুষ। অতীতের কোনো ভুল কিংবা তাঁর কোনো কথা বা কাজে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। সামনে জীবনের বাকি সময়টা যেন মানুষের কাজে লাগাতে পারেন, সেটিই এখন তাঁর প্রত্যাশা।
শুধু নিজের ভালো থাকার চিন্তা কখনোই করেননি বলে জানান জাহিদ। সব সময়ই সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সেই চেষ্টাটা আরও বাড়াতে চান তিনি। তাঁর বিশ্বাস, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থাকলে দেশেরও উন্নতি হবে।
ব্যক্তি জীবনে দুই সন্তানের বাবা জাহিদ হাসান। তাঁর বড় মেয়ে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট পড়ছেন। ছেলে এ লেভেল শেষ করেছেন। শিগগিরই তিনিও দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য যাবেন বলে জানিয়েছেন জাহিদ।
দেশের বাইরে থাকা মেয়েকে অবশ্য প্রায়ই মনে পড়ে তাঁর। ফোনে কথা বলার সময় মেয়ে যখন বলে, ‘বাবা, এই খাবারটা মিস করছি, তোমাকে মিস করছি, বাসার সবাইকে মিস করছি’ তখন মন খারাপ হয়ে যায় জাহিদের। মেয়ের কথা মনে করে কখনো কখনো কান্নাও পায় তাঁর। এমনিতেই তিনি বেশ আবেগ প্রবণ। ভালো কিছু শুনলেও চোখে পানি আসে, আবার কারও কষ্ট দেখলে আরও বেশি আবেগতাড়িত হন।

জাহিদ হাসানের মেসজীবনের জন্মদিন
জন্মদিন এলেই ফিরে আসে পুরোনো দিনের স্মৃতিও। পরিবারের ছোট ছেলে হওয়ায় ছোটবেলায় জন্মদিনে থাকত বিশেষ আয়োজন। মা পায়েসসহ নানা খাবার রান্না করতেন। থাকত কেক, চানাচুর, কলাসহ আরও অনেক কিছু। কিন্তু আশির দশকের শেষ দিকে অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসার পর বদলে যায় সেই চিত্র। তখন শুরু হয় মেস জীবন। ১৯৮৯ সালের এক জন্মদিনে ধানমন্ডি ১৫ নম্বরের একটি মেসের ঘর ঝাড়ু দিচ্ছিলেন জাহিদ। চার-পাঁচজন মিলে একটি ঘরে থাকতেন। রান্নার জন্য বুয়া থাকলেও সব সময় খাবার মুখে তোলার মতো হতো না। তাই নিজেরাই ভাজি-তরকারি রান্না করে খেতেন।
সেই জন্মদিনে মেসের এক রুমমেটের বাবা, পেশায় আইনজীবী, জাহিদের জন্মদিনের কথা শুনে বলেছিলেন, মন খারাপ কোরো না পুলক (জাহিদ হাসানের ডাক নাম), এমন একটা দিন আসবে, যেদিন সারা দেশের মানুষ তোমার জন্মদিন পালন করবে। পরে অভিনয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা হলে সেই কথাটিই মনে পড়ে জাহিদের।

অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়েই সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন জাহিদ হাসান। থিয়েটারে কাজের শুরুতে দলের ঘর মোছাসহ নানা কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। পরে গড়ে ওঠে নাট্যকেন্দ্র। মেসজীবনের সেই দিনগুলোর কষ্ট তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
জাহিদের ভাষায়, কষ্টের মধ্যেও এক ধরনের শান্তি আছে, আবার কষ্টের মধ্যে অশান্তিও আছে। জীবনে কোনো কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। তাই কষ্টের পরের সুখটা আসলে অন্য রকম।
সেই সময় থেকেই ছাড় দেওয়া ও ভাগাভাগি করে নেওয়া শিখেছেন তিনি। মেসজীবনের একটি মজার স্মৃতি মনে করে জাহিদ বলেন, বাথরুমে সাবান-শ্যাম্পু রেখে এলে অন্যরা সেগুলো ব্যবহার করত। এতে তাঁর আপত্তি ছিল না। তাঁর কাছে সেটিও ছিল একসঙ্গে থাকার জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
ছয় দশকের পথ পেরিয়ে আজ জাহিদ হাসানের জীবনে এসেছে নতুন এক উপলব্ধি। জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের পাশাপাশি সংগ্রামের দিনগুলোও তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান তিনি। আর জীবনের বাকি সময়টা যেন মানুষের কাজে আসে ৬০তম জন্মদিনে এটাই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া।










