শোনো গো দখিনো হাওয়া’, ‘তুমি এসেছিলে পরশু’ কিংবা ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এসব গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শচীন দেববর্মনের নাম। সংগীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতে নিজস্ব ধারা তৈরি করেছিলেন তিনি। আজ ১ অক্টোবর, কিংবদন্তি এই সংগীতজ্ঞের জন্মদিন।
১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন শচীন দেববর্মন। সংগীতাঙ্গনে তিনি ‘এস ডি বর্মণ’ এবং শ্রদ্ধাভরে ‘শচীন কর্তা’ নামে পরিচিত ছিলেন। ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত দেববর্মন পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মন ছিলেন সেতারবাদক ও ধ্রুপদি সংগীতশিল্পী। বাবার কাছেই সংগীতে তাঁর হাতেখড়ি।
শৈশবের একটি সময় আগরতলার কুমার বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করেন শচীন দেববর্মন। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়েন। ১৯২২ সালে আইএ এবং ১৯২৪ সালে বিএ পাস করেন তিনি। শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি সংগীতচর্চাও চলতে থাকে সমানতালে। ১৯২৫ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সংগীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দের কাছে তালিম নেন।
১৯৩৪ সালে অল ইন্ডিয়ান মিউজিক কনফারেন্সে গান পরিবেশন করে সংগীতাঙ্গনে নিজের পরিচিতি আরও দৃঢ় করেন শচীন দেববর্মন। পরের বছর বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে ঠুমরি পরিবেশন করেন। তাঁর কণ্ঠ ও পরিবেশনে মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ।

শচীন দেববর্মনের মুম্বাই যাত্রায় নতুন অধ্যায়
শচীন দেববর্মনের সংগীত জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৪০ সালে। শশধর মুখোপাধ্যায়ের অনুরোধে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান তিনি। এরপর বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে তৈরি করেন নিজের স্বতন্ত্র জায়গা। ‘মাটির ঘর’, ‘তেরে ঘর কে সামনে’, ‘মিস ইন্ডিয়া’, ‘প্রেম পূজারী’সহ বহু চলচ্চিত্রে তাঁর সুর শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
তাঁর সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফি, আশা ভোসলে, মান্না দে, গীতা দত্ত, মুকেশ ও তালাত মাহমুদের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা। শুধু চলচ্চিত্রের সংগীত নয়, বাংলা লোকসংগীত ও আধা-শাস্ত্রীয় ধারার গানেও তাঁর ছিল গভীর দখল। কবি জসীমউদ্দীনের লেখা ‘নিশিথে যাইয়ো ফুলবনে’ গানটিও তাঁর কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পায়।

দীর্ঘ সংগীত জীবনে ১০০টির বেশি চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন শচীন দেববর্মন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ফিল্মফেয়ার সেরা সংগীত পরিচালক পুরস্কার, সংগীত নাটক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড ও পদ্মশ্রীসহ বিভিন্ন সম্মাননা।
১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর মারা যান শচীন দেববর্মন। তবে তাঁর সৃষ্টি থেমে যায়নি। সময় পেরিয়ে আজও তাঁর সুর ও কণ্ঠে গাওয়া গান শ্রোতাদের কাছে ফিরে আসে নতুন করে। সংগীতের ইতিহাসে তাই শচীন দেববর্মন শুধু একজন সুরকার নন, তিনি দুই বাংলার শ্রোতাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা এক কালজয়ী নাম।









