Thursday, October 15, 2026

বাংলা সিনেমা দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক করেছিলেন বিদ্যা বালান

আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা নায়িকা কে ?

October 12, 2026

সালমান শাহ কেন এত অল্প সময়ে কিংবদন্তি হয়ে গেলেন?

October 2, 2026

কেন অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যাওয়া ছেড়ে দিলেন আমির খান?

September 26, 2026

সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোর অবিশ্বাস্য গল্প 

September 17, 2026

শত শত কোটি বাজেট, তবুও ভয়াবহ ফ্লপ!

September 10, 2026

আজ বিদ্যা বালান বলিউডের পরিচিত মুখ। অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ নানা স্বীকৃতি। ‘কাহানি’, ‘দ্য ডার্টি পিকচার’ কিংবা ‘ইশকিয়া’  সিনেমায় ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি। তবে তাঁর বড় পর্দার যাত্রার শুরুটা হয়েছিল হিন্দি সিনেমা দিয়ে নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের হাত ধরে।

২০০৩ সালে পরিচালক গৌতম হালদারের ‘ভালো থেকো’ ছবির মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় বিদ্যা বালানের। কেরালায় জন্ম নেওয়া এবং মুম্বাইয়ে বেড়ে ওঠা বিদ্যার জন্য বাংলা ভাষা ও চলচ্চিত্রের জগৎ ছিল নতুন। সেই ভাষায় সংলাপ বলা থেকে শুরু করে চরিত্রের অনুভূতি বুঝে পর্দায় তা ফুটিয়ে তোলা সবই ছিল তাঁর জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা।

কিন্তু বাংলা সিনেমায় কীভাবে সুযোগ পেলেন বিদ্যা? তাঁর প্রথম ছবির আনন্দী চরিত্রটি কীভাবে হয়ে উঠেছিল অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়? আর সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর ক্যারিয়ারকে কতটা প্রভাবিত করেছিল?

বারবার বাধা, তবু থামেননি

অভিনয়ের প্রতি বিদ্যা বালানের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ছোটবেলাতেই। কিশোরী বয়সে হিন্দি টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘হাম পাঁচ’ এ অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এরপর স্বপ্ন দেখেন বড় পর্দায় নিজের জায়গা তৈরি করার।

তবে সেই পথ সহজ ছিল না। মালয়ালম ছবি ‘চক্রম’এ অভিনয়ের সুযোগ পেলেও ছবিটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে আরও কয়েকটি সুযোগ হারাতে হয় তাঁকে। কিন্তু একের পর এক বাধা এলেও অভিনয়ের স্বপ্ন থেকে সরে দাঁড়াননি বিদ্যা। মুম্বাইয়ে বিজ্ঞাপনচিত্র ও মিউজিক ভিডিওতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।

এমনই একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের সূত্র ধরে তাঁর কাছে আসে বাংলা সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব। পরিচালক গৌতম হালদার তখন ‘ভালো থেকো’ ছবির জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন। বিদ্যাকে দেখে তাঁর মনে হয়, আনন্দী চরিত্রটির জন্য এই তরুণী উপযুক্ত হতে পারেন। সেই সুযোগই বদলে দেয় বিদ্যার অভিনয়জীবনের গতিপথ। যে ভাষায় তিনি আগে কখনো অভিনয় করেননি, সেই বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র দিয়েই শুরু হয় তাঁর বড় পর্দার যাত্রা।

স্মৃতি, বিচ্ছেদ আর নিঃসঙ্গতার গল্প

২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ভালো থেকো নির্মিত হয়েছে লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জন্মদিন’ গল্প অবলম্বনে। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র আনন্দী, যার ভূমিকায় অভিনয় করেন বিদ্যা বালান। তাঁর সঙ্গে ছবিতে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, জয় সেনগুপ্ত, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়সহ আরও অনেকে।

বিদ্যা বালান - ভালো থেকো

আনন্দীর জীবন আবর্তিত হয় পরিবার, ভালোবাসা, স্মৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ককে ঘিরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় তার চেনা পৃথিবী। একের পর এক ঘটনা তাকে ঠেলে দেয় নিঃসঙ্গতার দিকে।

আনন্দীর ভাই নকশালপন্থীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং একসময় নিখোঁজ হয়ে যায়। ছেলেকে হারানোর শোক সহ্য করতে না পেরে তার বাবা-মায়েরও মৃত্যু হয়। বোনের বিয়ে হয়ে গেলে সেও নিজের সংসারে চলে যায়। এভাবে ধীরে ধীরে আনন্দী হারিয়ে ফেলে তার পরিচিত জগতের মানুষদের। এর মধ্যে রয়েছে বাবুয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কের গল্পও। বাবুয়া বিদেশে চলে যায় এবং পরে অন্য এক নারীকে বিয়ে করে। আনন্দীর জীবনে তৈরি হয় আরও এক শূন্যতা।

তবে ভালো থেকো কেবল হারানো আর বিচ্ছেদের গল্প নয়। অতীতের স্মৃতি, প্রকৃতির প্রতি টান এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টার মধ্য দিয়ে ছবিটি তুলে ধরে একজন মানুষের ভেতরের জগৎ। আনন্দীর জীবনের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে যাতায়াত করতে করতে দর্শকও পরিচিত হন তার নিঃসঙ্গতা ও অনুভূতির সঙ্গে। এই চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে বিদ্যাকে শুধু সংলাপ বলতে হয়নি; বুঝতে হয়েছে আনন্দীর অনুভূতি, তার হারানোর বেদনা এবং চারপাশের পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্কও।

নতুন ভাষা, নতুন চ্যালেঞ্জ

বাংলা ভাষা বিদ্যা বালানের মাতৃভাষা ছিল না। তাই ভালো থেকো ছবিতে অভিনয়ের জন্য তাঁকে নতুন করে ভাষাটি শিখতে হয়। শুটিংয়ের সময় সংলাপ বারবার অনুশীলন করতেন তিনি। তাঁর ইচ্ছা ছিল, নিজের সংলাপ নিজের কণ্ঠেই বলবেন।

কিন্তু শুটিংয়ের পর ডাবিংয়ের সময় দেখা যায়, তাঁর বাংলা উচ্চারণে তখনো কিছু সমস্যা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছবিতে বিদ্যার সংলাপের জন্য ব্যবহার করা হয় অন্য এক শিল্পীর কণ্ঠ।

নতুন অভিনেত্রী হিসেবে এই অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। তবে বিষয়টিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেই থেমে থাকেননি তিনি। বিদ্যা পরবর্তী সময়ে নিজেই জানিয়েছেন, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বাংলা ভাষা আরও ভালোভাবে শেখার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল। পরে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞাপনচিত্রের সংলাপ নিজে বলার দক্ষতাও অর্জন করেন তিনি।

এখানেই ভালো থেকো ছবিটির গুরুত্ব। এটি যেমন বিদ্যার প্রথম চলচ্চিত্র, তেমনি একটি নতুন ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচিত হওয়ার এবং নিজের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠারও শুরু। অভিনয়ের সুযোগকে কাজে লাগাতে গিয়ে তাঁকে শিখতে হয়েছে নতুন ভাষা, মানিয়ে নিতে হয়েছে নতুন পরিবেশের সঙ্গে।

প্রথম ছবিতেই স্বীকৃতি

মুক্তির পর ভালো থেকো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনটি স্বীকৃতি পায়- সেরা চিত্রগ্রহণ, সেরা অডিওগ্রাফি এবং বিশেষ জুরি পুরস্কার। ছবিতে আনন্দী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বিদ্যা বালান ২০০৪ সালে আনন্দলোক পুরস্কারে বাংলা ছবির সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান।

একজন নবাগত অভিনেত্রীর জন্য এই স্বীকৃতি ছিল উল্লেখযোগ্য অর্জন। বাংলা সিনেমায় অভিষেকের পর কয়েক বছরের মধ্যেই হিন্দি চলচ্চিত্রেও নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেন তিনি। 

২০০৫ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত প্রদীপ সরকারের ‘পরিণীতা’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় অভিষেক হয় বিদ্যার। এরপর একের পর এক ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন তিনি।

বিদ্যা বালান - পরিণীতা

‘পা’, ‘ইশকিয়া’, ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকা’ এবং ‘কাহানি’  প্রতিটি ছবিতে চরিত্রের ধরন ও অভিনয়ের ধরনে ছিল ভিন্নতা। ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ডার্টি পিকচার’ এ সিল্ক স্মিতার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান বিদ্যা। অন্যদিকে, ‘কাহানি’  ছবিতে বিদ্যা বাগচীর চরিত্র তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম আলোচিত চরিত্র হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে ‘তুমহারি সুলু’, ‘শেরনি’, ‘জলসা’ এবং ‘ভুলভুলাইয়া ৩’এর মতো ছবিতেও অভিনয়ের বৈচিত্র্য দেখিয়েছেন তিনি। প্রচলিত নায়িকাসুলভ চরিত্রের বাইরে গিয়ে গল্প ও চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে বদলে নেওয়াই তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

বাংলা থেকে আরও নানা ভাষার পথে

বাংলা সিনেমা দিয়ে শুরু হলেও বিদ্যা বালানের অভিনয়জীবন কোনো একটি ভাষা বা চলচ্চিত্রশিল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হিন্দি সিনেমায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের গল্প ও চরিত্রে কাজ করে গেছেন তিনি।

২০২৬ সালে মুক্তি পেয়েছে তাঁর অভিনীত ‘রাজা শিবাজি’। এ ছাড়া রজনীকান্ত অভিনীত তামিল ছবি ‘জেলার ২’ এ তাঁর অভিনয়ের কথা রয়েছে, যার মুক্তির তারিখ নির্ধারিত ১৫ অক্টোবর ২০২৬। তামিল ছবিতে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। অন্যদিকে, প্রায় ১৫ বছর পর নির্মাতা একতা কাপুর ঘোষণা দিয়েছেন ‘দ্য ডার্টি পিকচার ২’  নির্মাণের। তবে সিক্যুয়েলটিতে বিদ্যা বালান থাকছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

যে গল্পের শুরু ‘ভালো থেকো’  দিয়ে

ভালো থেকো ছবির আনন্দীকে জীবনের নানা পর্যায়ে একের পর এক হারানোর মুখোমুখি হতে হয়। আর বাস্তবের বিদ্যা বালানকেও অভিনয়জীবনের শুরুতে পেরোতে হয়েছে প্রত্যাখ্যান, অনিশ্চয়তা এবং নতুন ভাষায় কাজ করার চ্যালেঞ্জ।

দুই জীবনের অভিজ্ঞতা এক নয়। তবু বিদ্যার যাত্রার শুরুর দিকে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, সুযোগ হারানোর পরও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তাঁর পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

আজ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ নানা স্বীকৃতিতে সমৃদ্ধ বিদ্যা বালান নিজের অভিনয়গুণে বলিউডে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন। অথচ সেই যাত্রার প্রথম অধ্যায় লেখা হয়েছিল বাংলা সিনেমায়, আনন্দী নামের এক নিঃসঙ্গ তরুণীর গল্পের মধ্য দিয়ে।

তাই ভালো থেকো শুধু বিদ্যা বালানের প্রথম ছবির নাম নয়। এটি তাঁর দীর্ঘ অভিনয়যাত্রার সূচনা।

Share

Read more

Local News