৫১তম টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব (টিআইএফএফ) নেটপ্যাক পুরস্কার জিতেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার শরণার্থীশিবিরে বেড়ে ওঠা ১৩ বছরের কিশোরী রাঘাদের গল্প নিয়ে ফিলিস্তিনি নির্মাতা হোসাম আবু দানের নির্মিত ‘থার্টিন ইন গাজা’। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম বা দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা পরিচালকদের কাজের মধ্য থেকে সেরা ছবিকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
রোববার ১১ দিনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের টিআইএফএফ। শেষ দিনে টরন্টোর লাইটবক্সে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন বিভাগের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। একই দিন দুপুর থেকে দর্শকদের জন্য পিপলস চয়েজ পুরস্কারজয়ী ছবিগুলোর বিনা মূল্যে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
উৎসবের শেষ দিনে দর্শক উপস্থিতি নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন টিআইএফএফের প্রধান নির্বাহী ক্যামেরন বেইলি। পুরস্কার ঘোষণার পর লালগালিচায় তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, টিআইএফএফের দর্শকভিত্তি আগের মতোই শক্তিশালী; বরং আরও শক্তিশালী।’
এবার উৎসবে ৭২টি দেশের ২৯৪টি ছবি প্রদর্শিত হয়েছে। ৯৮টি লালগালিচা আয়োজনে অংশ নিয়েছেন আট শতাধিক শিল্পী ও চলচ্চিত্রকর্মী। স্বীকৃত গণমাধ্যমকর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজার এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ২৭৯ জন পরিচালক উৎসবে অংশ নেন। প্রথমবার আয়োজিত ‘টিআইএফএফ: দ্য মার্কেট’-এ ছিলেন প্রায় ৭ হাজার প্রতিনিধি।
গাজার গল্পে নেটপ্যাক পুরস্কার

‘থার্টিন ইন গাজা’ হোসাম আবু দানের প্রথম কাহিনিচিত্র। ৭৭ মিনিটের ছবিটির গল্প গাজার একটি বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরে বাবার সঙ্গে থাকা ১৩ বছরের রাঘাদকে ঘিরে। কৈশোরে পা দেওয়া রাঘাদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতা ও সংকটও উঠে এসেছে ছবিতে। ছবিটি পুরোপুরি গাজায় স্থানীয় ফিলিস্তিনি কলাকুশলীদের নিয়ে ধারণ করা হয়েছে। টিআইএফএফের সেন্টারপিস বিভাগে এর বিশ্ব উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়।
ছবিটিকে নেটপ্যাক পুরস্কারের জন্য নির্বাচনের ব্যাখ্যায় জুরি বলেছে, গাজার চলমান পরিস্থিতিকে ছবিটি নিছক দুর্ভোগের প্রদর্শনীতে পরিণত করেনি। বরং শক্তিশালী দৃশ্যের মাধ্যমে মানুষের জীবনের নানা জটিলতা তুলে ধরেছে। জুরির ভাষায়, এটি একটি ‘সাহসী ও জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র’ এবং এর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ নতুন একটি কণ্ঠের আগমন ঘটেছে।
নেটওয়ার্ক ফর দ্য প্রমোশন অব এশিয়ান প্যাসিফিক সিনেমা (নেটপ্যাক) আয়োজিত এই পুরস্কারের জন্য তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক জুরি উৎসবে প্রদর্শিত এশীয় চলচ্চিত্রগুলোর মধ্য থেকে সেরা ছবি নির্বাচন করে। এবারের জুরির সভাপতি ছিলেন রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক মারা মাত্তা। অন্য দুই সদস্য ছিলেন শিল্পী ও লেখক রিচার্ড ফাং এবং চলচ্চিত্র সমালোচক পানাইয়োতিস কোটজাথানাসিস।
পুরস্কার পাওয়ার পর এক বিবৃতিতে হোসাম আবু দান বলেন, গাজার কণ্ঠ দর্শকের কাছে পৌঁছেছে যা তাঁদের জন্য গর্বের বিষয়। গাজার অসংখ্য বেদনাদায়ক গল্পের মধ্য থেকে একটি মানুষের গল্প বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পেরেছেন বলেও জানান তিনি।
দর্শকের সেরা ‘লা বোলা নেগ্রা’

টিআইএফএফের মূল পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে হাভিয়ের কালভো ও হাভিয়ের আমব্রোসির স্প্যানিশ ছবি ‘লা বোলা নেগ্রা’। ১৯৭৮ সাল থেকে দর্শকের ভোটে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
এবার প্রথম রানারআপ হয়েছে পিটার ফ্যারেলির ‘আই প্লে রকি’ এবং দ্বিতীয় রানারআপ শান হেডারের ‘বিয়িং হিউম্যান’।
‘লা বোলা নেগ্রা’র গল্প বিস্তৃত ১৯৩২, ১৯৩৭ ও ২০১৭ এই তিন সময়ে। স্পেনের তিন পুরুষের জীবন, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও যন্ত্রণাকে একই সূত্রে এনেছে ছবিটি। টরন্টোর আগে কান চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি আলোচনায় আসে। সেখানে হাভিয়ের কালভো ও হাভিয়ের আমব্রোসি যৌথভাবে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পান। পরে ছবিটির স্বত্ব কিনে নেয় নেটফ্লিক্স।
পুরস্কার নিতে দুই নির্মাতা টরন্টোর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। ছবির প্রচারণার কাজে তাঁরা তখন স্পেনে ছিলেন। তাঁদের পাঠানো বার্তা মঞ্চে পড়ে শোনান ক্যামেরন বেইলি। নির্মাতারা জানান, ছবিটি তাঁদের অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি কাজ। এতে নিজের পরিচয় প্রকাশের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। টরন্টোর দর্শকেরা ছবিটির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছেন এবং এটিকে আপন করে নিয়েছেন-এটাই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় উপহার।
অস্কারের পথে ভারতের ‘আং’

ভারতীয় নির্মাতা থেজা রিওর ‘আং’ পেয়েছে প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার। ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাগাল্যান্ডের একটি গ্রামের শেষ জীবিত প্রধানকে ঘিরে ছবিটির গল্প। এর বেশির ভাগ সংলাপ কোনিয়াক ভাষায়।
পুরস্কার পাওয়ার পর থেজা রিও দ্য কানাডিয়ান প্রেসকে বলেন, নিজের জন্মভূমিকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানানোই ছিল তাঁর প্রথম লক্ষ্য। নিজের জনগোষ্ঠীর গল্প ও কণ্ঠস্বর তুলে ধরাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। সেই ছবি নিয়ে টরন্টোয় এসে পুরস্কার পাওয়া তাঁর কাছে স্বপ্ন পূরণের মতো।
এবার প্ল্যাটফর্ম পুরস্কারের গুরুত্বও বেড়েছে। প্রথমবারের মতো এই পুরস্কারজয়ী অ-ইংরেজি ভাষার ছবি অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। তবে অস্কারের অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হবে। ‘আং’-এর অধিকাংশ সংলাপ কোনিয়াক ভাষায় হওয়ায় ভাষাসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করছে ছবিটি।
মায়ের কথা বলতে গিয়ে কাঁদলেন কোডি
কানাডীয় নির্মাতা কোডি লাইটনিংয়ের ‘স্মাজ দ্য ব্লেডস’ পেয়েছে বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড। পুরস্কার গ্রহণের সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নির্মাতা।
কোডি জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে আকস্মিকভাবে মারা গেছেন তাঁর মা জর্জিনা লাইটনিং। তিনিও চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন। মায়ের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন কোডি। তিনি বলেন, বাবার কাছ থেকে রসবোধ আর মায়ের কাছ থেকে গল্প বলার ক্ষমতা পেয়েছেন। এরপর তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার আমার মায়ের জন্য।’
পরে লালগালিচায় কোডি জানান, ছবিটির শুটিংয়ের সময় তাঁর মা প্রায়ই সেটে থাকতেন এবং এই কাজ নিয়ে তিনি নিশ্চয়ই গর্বিত হতেন।
কানাডার সেরা ‘সানবার্ন’
সেরা কানাডীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে সারভিল পোবলেতের ‘সানবার্ন’। টরন্টোর ব্লিকার স্ট্রিট এলাকার একদল কিশোর-কিশোরীর বেড়ে ওঠার গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিটি। জুরির মতে, ছবিটি প্রাণবন্ত, মজার এবং গভীরভাবে মানবিক।

আন্তর্জাতিক পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে সাইমন স্টোনের ‘এলসিনোর’। প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে দর্শকের পছন্দ হয়েছে ব্যারি অ্যাভরিচের ‘ডারলিন লাভ: আই নো হোয়্যার আই’ভ বিন’। আর মিডনাইট ম্যাডনেস বিভাগে পিপলস চয়েজ পুরস্কার পেয়েছে ম্যাথিউ র্যানকিনের ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, ব্রায়ান মালরনি’।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের সংগঠন ফিপ্রেসির পুরস্কার পেয়েছে আইরিশ লেখক-নির্মাতা ডেভিড টারপিনের ‘অ্যানসেস্টরস’। আশির দশকের লন্ডনে বসবাসকারী এক আইরিশ ব্যক্তির জীবনকে ঘিরে নির্মিত ছবিটি।
সব মিলিয়ে এবারের টিআইএফএফে ১২টি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া উৎসবের ১১ দিনের আয়োজন শেষ হয় রোববার। পুরস্কার ঘোষণা ও বিশেষ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শেষ দিনেও লাইটবক্সে ছিল সিনেমাপ্রেমীদের উপস্থিতি।






