চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ আবারও পিছিয়েছে। স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে করা এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৮ ডিসেম্বর নতুন দিন ধার্য করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নির্ধারিত দিনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই ওয়াজেদ আলী বিষয়টি জানিয়েছেন।
গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় মামলাটি করেন। এতে সামিরা হকসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ আনা হয়।

৩০ বছর আগে মৃত্যু, এখন শেষ হয়নি তদন্ত
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তাঁর পুরো নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। মৃত্যুর সময় ঢালিউডে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন এই অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুর পর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন।
পরবর্তী সময়ে ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। একই বছরের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সংস্থাটি জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।
সিআইডির ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন সালমান শাহর বাবা। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। সেই প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্তেও ওঠে আত্মহত্যার কথা
সালমান শাহর বাবার মৃত্যুর পর মামলাটি চালিয়ে যান তাঁর মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন তিনি। সেখানে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহ প্রকাশ করেন।
এরপর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার ষষ্ঠ বিশেষ জজ ইমরুল কায়েশ র্যাবকে আর তদন্ত না করার নির্দেশ দেন। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
প্রায় চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৪ জনের সাক্ষ্য, জব্দ করা আলামত ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করেও হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়েছিল, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে সালমান শাহর ঘনিষ্ঠতা এবং স্ত্রী সামিরা হকের সঙ্গে দাম্পত্য কলহের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন অভিনেতা। পাশাপাশি মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার যন্ত্রণাও তাঁকে ভুগিয়েছিল। এসব কারণে অভিমান থেকে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে আরও তদন্তের দাবি জানান তিনি। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।
এরপর ওই আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করে সালমান শাহর পরিবার। ২০২২ সালের ১২ জুন আবেদনটি গ্রহণ করা হলেও দীর্ঘদিন শুনানি হয়নি।

আবারও হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মায়ের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং সন্দেহভাজন রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি বিবেচনায় নিয়ে রমনা মডেল থানাকে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।
মামলায় আসামি করা হয়েছে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, তাঁর মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, চলচ্চিত্রের খলনায়ক আশরাফুল হক ওরফে ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদকে।
এজাহারে তাঁদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। শুরুতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব রমনা থানা পুলিশের কাছে থাকলেও পরে তা সিআইডিকে দেওয়া হয়।
এখন নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৮ ডিসেম্বর দিন ধার্য রয়েছে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে চলা এই মামলার তদন্তে এবার কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকে নজর রয়েছে সালমান শাহর পরিবার ও তাঁর ভক্তদের।






