ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ রাসুলফ
বিখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ রাসুলফ শুক্রবার ৩০ জানুয়ারি নেদারল্যান্ডের রটারডামে তাঁর নিজের মাতৃভূমিতে চলমান বিক্ষোভের ওপর সহিংস দমন-পীড়ন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্পষ্টভাবেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। রটারড্যামে রাসুলফ- ইরানের ‘গণহত্যা’ ও জার্মান জীবনের উপলব্ধির কথাও জানান।
নেদারল্যান্ডসের বন্দরনগরীতে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘দ্য সিড অব দ্য সেক্রেড ফিগ, ‘দেয়ার ইজ নো ইভিল’ নির্মাতা রসুলফ বলেছেন, “ইসলামিক রিপাবলিক (ইরান) যে গণহত্যা চালিয়েছে, সে বিষয়ে আমি ইরানের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানাই এবং তাঁদের সঙ্গে আমার গভীর যৌথ শোকের অনুভূতি প্রকাশ করতে চাই।”

রটারড্যামে রাসুলফের ‘সেন্স অব ওয়াটার’
উক্ত সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে রসুলফের নির্মিত পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিশ্ব প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে সিরিয়া, আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও ইউক্রেনের নির্মাতাদের চলচ্চিত্রও প্রদর্শিত হয় সেখানে। ওই সিনেমাগুলোর প্রত্যেকটি ‘ডিসপ্লেসমেন্ট ফিল্ম ফান্ড’ থেকে ১ লাখ ইউরো (১ লাখ ২০ হাজার ডলার) অনুদান পেয়েছে। এই উদ্যোগটি গত বছর কেট ব্ল্যানচেট এবং ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারডাম (আইএফএফআর)-এর হুবার্ট বালস ফান্ড যৌথভাবে ঘোষণা করে।

ডিসপ্লেসমেন্ট ফিল্ম ফান্ডের অনুদানপ্রাপ্ত রসুলফের ‘সেন্স অব ওয়াটার’ স্বল্পদৈর্ঘ্যটির প্রিমিয়ার হয়। চলচ্চিত্রটি রাসুলফ নিজেই লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন। ৩৯ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আলি নূরানি ও বেহনুশ নাজিবি। গল্পটি একটি নির্বাসিত ইরানি লেখকের ওপর কেন্দ্র করে নির্মিত, যিনি একটি বিদেশী ভাষা, বিশেষ করে জার্মান ভাষার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন। চলচ্চিত্রে দেখা যায়, নতুন করে লেখা শুরু করার জন্য তাকে ভালবাসা, ক্রোধ, আনন্দ ও দুঃখের মতো বিষয়গুলোকে পুনরায় আবিষ্কার করতে হচ্ছে।
সিনেমার প্রধান চরিত্রের যাত্রা স্পষ্টভাবেই রাসুলফের নিজস্ব যাত্রার প্রতিফলনই বহন করে। কারণ, ২০২৪ সালে, রাসুলফকে ইরানের আদালত আট বছরের কারাদণ্ড দেয়। সেই কারাদন্ড এড়াতে নিজ দেশের বাইরে পালাতে হয়েছিল তাকে। রসুলফের চলচ্চিত্র ‘স্যাক্রেড ফিগ’ ২০২৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড জিতেছিল এবং তাঁর নতুন আবাসস্থান জার্মানি থেকে সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার চলচ্চিত্রের অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল।

রটারড্যামে রাসুলফ তাঁর জার্মান জীবনের উপলব্ধিতে যা বললেন
রাসুলফ বলেন, “ইরান ছেড়ে ইউরোপে আসার পর আমার জন্য এটি একটি খোলা প্রশ্ন ছিল। এরকম অজানা এলাকায় নির্বাসিত অবস্থায় নতুন সংস্কৃতিতে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করা কেমন হবে, যা আমি খুব ভালোভাবে জানতাম না।” তিনি যোগ করেন, “আমি নিশ্চিত ছিলাম না আমার অতীত ও সংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে কি না। এমন একটি গল্প বলা সম্ভব হবে কিনা যা বিশ্বের যে কোনো দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় মনে হবে।”
রাসুলফ বলেন, তাঁর দৃষ্টি ভাষার নিজস্ব আবেগগত ওজনের দিকে সরছিলো। “আমি যা সত্যিই পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণা করা শুরু করেছি এই নিয়ে, তা হল শব্দের আবেগগত মান এবং বোঝার ও অনুভবের মধ্যে ফাঁক ও যে ব্যবধান আছে। আমি সত্যিই চাইছিলাম এই অনুভূতিটি বিশ্বের সকলের সঙ্গে ভাগ করতে, যারা একই পরিস্থিতিতে জীবন যাপন করছে, এবং দেখাতে চাইছিলাম যে হ্যাঁ, আমরা ভাষার প্রাচীর ভাঙতে পারি এবং কোনো শব্দের অর্থ বোঝার স্তর থেকে সেই শব্দের অনুভূতিতে পৌঁছাতে পারি, এমনকি বিদেশি ভাষায়ও।”
রাসুলফ সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন আবার ইরানের কথা বলে। তিনি রটারডামের দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, “তবু, আমি অনুভব করেছি যে কিছু বিষয়, শব্দ বরং অনুভূতির বাইরে, আরও গুরুত্বপূর্ণ, উচ্চতর হয়ে ধরা দেয়। আর তা হল-আমার দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, সেখানে যা ঘটে চলেছে।”


