ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কবি ও অভিনেতা রিফাত চৌধুরী। দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যায় ১৪ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এখন চলছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বর্তমানে নতুন ভবনের মেডিসিন ইউনিট-৩-এর ১০৩ নম্বর কেবিনে চিকিৎসা চলছে তাঁর। চিকিৎসকরা জানান, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে তাঁর কোমরে জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই কঠিন সময়েও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন রিফাত চৌধুরী সুস্থ হয়ে ফিরলে আর অভিনয় করতে চান না, মন দিতে চান নাটক নির্মাণে।
এখন কেমন আছেন রিফাত চৌধুরী
দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন রিফাত চৌধুরী। টানা ১০ কদম হাঁটতেও কষ্ট হয় তাঁর। হঠাৎ পা অবশ হয়ে যায়। এর মধ্যে কয়েকবার জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছেন। সর্বশেষ একটি নাটকের শুটিংয়ের সময় মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বর্তমানে শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন রিফাত। তাঁর ভাষায়, মূল চিকিৎসা শুরু হওয়ার পরই পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বলা যাবে।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুরুতে চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন তিনি। পরে তাঁর এক চিকিৎসক বন্ধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি জানান। এরপর গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তাঁর বিষয়ে নজর দেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে ফোন করে খোঁজ নিচ্ছেন।
রিফাত চৌধুরী বলেন, এত মানুষ যে তাঁকে ভালোবাসেন, তা আগে বুঝতে পারেননি। এখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
হাসপাতালে কথা বলার সময়ও বারবার তাঁর খোঁজ নিতে আসছিলেন নার্স, কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা। কেউ জানতে চাইছেন প্রয়োজন আছে কি না, কেউ নিশ্চিত হচ্ছেন সব ঠিকঠাক চলছে কি না। তাঁদের আশ্বস্ত করে রিফাতের উত্তর, তিনি ভালো আছেন।

রিফাত অভিনয় করেন পাঁচ শতাধিক নাটকে
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাঁচ শতাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন রিফাত চৌধুরী। ‘হাউসফুল’, ‘এইম ইন লাইফ’, ‘পাটিগণিত’, ‘ফোর টোয়েন্টি’, ‘সিক্সটি নাইন’, ‘বনমানুষ’, ‘বাইসাইকেল’, ‘৪২০’, ‘ক্যারাম’ ও ‘মুড়ির টিন’ এর মতো নাটকে দেখা গেছে তাঁকে। বিশেষ করে ‘সিক্সটি নাইন’ নাটকের ‘জাতীয় কাকা’ চরিত্রটি তাঁকে দর্শকের কাছে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
তবে এত পরিচিতির পরও অভিনয় কখনো তাঁর স্বপ্ন ছিল না। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বরং কবি হিসেবেই স্বস্তি পান রিফাত চৌধুরী।
বন্ধুদের আড্ডায় এক নাটকে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। অনেকটা মজা করেই রাজি হয়ে যান। পরে সেই কাজই তাঁকে নিয়ে আসে ক্যামেরার সামনে। জীবনধারণের প্রয়োজনেই অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
রিফাত চৌধুরীর বলেন, সবাই তাঁকে অভিনেতা হিসেবে চিনলেও তাঁর নিজের কাছে লেখালেখিই মূল। অভিনয়ের মধ্যে তিনি বাস্তবের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু কবিতা ও লেখালেখির মাধ্যমেই নিজের ভাবনাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারেন।
এখন পর্যন্ত তাঁর ২৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘আলিঙ্গনের নাম’। এত বছর পরও কবি পরিচয়টিই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সুস্থ হয়ে পরিচালনায় মন দিতে চান
৬৫ বছর বয়সকে জীবনের শেষ প্রান্ত হিসেবে দেখছেন না রিফাত চৌধুরী। বরং এই সময়টুকুকে তিনি ‘বোনাস’ হিসেবে দেখছেন। সামনে কতদিন বাঁচবেন, কী করবেন। এসব নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা নেই তাঁর।
তবে একটি পরিকল্পনা আছে। সুস্থ হয়ে ফিরতে পারলে আর অভিনয়ে ফিরতে চান না তিনি। বরং টেলিভিশনের জন্য নাটক নির্মাণে মন দিতে চান।
রিফাত চৌধুরী বলেন, সুস্থ হয়ে উঠলে অভিনয় করবেন না, নাটক বানাবেন। অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে নয়, এবার ক্যামেরার পেছনে থেকেই কাজ করতে চান তিনি।

সরকারি সহায়তা চান না রিফাত
চিকিৎসার পেছনে ইতোমধ্যে বেশ কিছু টাকা খরচ হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার সব মিলিয়ে ব্যয় বাড়ছে। হাসপাতাল থেকে ফেরার পরও শারীরিক কারণে কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে হতে পারে। ফলে সামনে চিকিৎসা ও জীবনযাপনের খরচ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা নেওয়ার কথা ভাবছেন না রিফাত চৌধুরী। বরং এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান বেশ স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, সরকার জনগণের অর্থেই পরিচালিত হয়। নিজের নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিয়েও তাঁর দীর্ঘদিনের আক্ষেপ রয়েছে।
নিজেকে ‘অনাগরিক’ হিসেবে উল্লেখ করে রিফাত বলেন, তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা হোল্ডিং নম্বর কিছুই নেই। এসব মৌলিক বিষয় নিয়েও সরকারের কাছে তাঁর প্রশ্ন রয়েছে।
হাসপাতাল থেকে বিদায়ের সময় আরেকটি আক্ষেপের কথা জানান এই কবি ও অভিনেতা। দীর্ঘ অভিনয় ও সাহিত্যজীবনে প্রকাশকদের কাছ থেকে পাওনা সম্মানী না পাওয়ার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি নিজের বই ও কবিতা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন।
তাঁর বিশ্বাস, কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংবাদমাধ্যম যদি নিয়মিতভাবে তাঁর বই ও লেখালেখিকে সামনে আনত, তাহলে কবিতা আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারত।







