যাত্রাশিল্পে আধুনিকায়ন
ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় যাত্রা শিল্পীদের প্রযোজনা ও পরিবেশনার মান উন্নত করার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। তারা বলেন, দর্শক টানতে এবং এই ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্যধারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই গুণগত পরিবর্তন, আধুনিকায়ন এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বুধবার রাজধানীর জাতীয় নাট্যশালার হলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত যাত্রা শিল্পী, দলনেতা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা এতে অংশ নেন। কর্মশালাটি যাত্রা শিল্পের বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য, সম্প্রচার, সংস্কৃতি ও নীতি ও কৌশল বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিতাই রায় চৌধুরী জানান, এখন থেকে যাত্রা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রাথমিক অনুমোদন সরাসরি মন্ত্রণালয় দেবে। এর ফলে শিল্পীদের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানি অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “শিল্পীদের সৃজনশীল কাজের পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

তিনি আরও বলেন, দর্শকদের জন্য সুস্থ, রুচিশীল ও মানসম্পন্ন বিনোদন নিশ্চিত করতে একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। এই নীতিমালা যাত্রা শিল্পসহ সব ধরনের লোকনাট্যকে আরও সংগঠিত ও পেশাদার রূপ দিতে সহায়তা করবে বলে তিনি মনে করেন।
কর্মশালায় আলোচক হিসেবে অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজা আরিফ ও আনান জামান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভীর নাহিদ খান। তারা যাত্রা শিল্পের সামাজিক গুরুত্ব, বর্তমান সংকট এবং আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যাত্রা গবেষক ও পালা রচয়িতা এম এ মাজিদ। তার প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল “যাত্রাশিল্পের সংকট, সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ”। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক জটিলতা, অনুমতি প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে যাত্রা শিল্পে নতুন বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। ফলে অনেক তরুণ শিল্পী ও উদ্যোক্তা এই শিল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যথাযথ সরকারি সহায়তা, আর্থিক প্রণোদনা এবং নীতিগত সহায়তা না পেলে আগামী দিনে অনেক যাত্রা দল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে দেশের সমৃদ্ধ লোকনাট্য ঐতিহ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি যাত্রা শিল্পকে রক্ষা ও পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটি সুসংহত জাতীয় নীতির আহ্বান জানান।

সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, যাত্রা পরিবেশনায় আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, সংলাপ উপস্থাপন, শরীরী ভাষা, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা, আলোকসজ্জা এবং বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রয়োজন। তার মতে, বর্তমান দর্শক অনেক বেশি সচেতন এবং বৈচিত্র্যময় বিনোদন প্রত্যাশা করে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই যাত্রাকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। তিনি বলেন, শিল্পীদের অবশ্যই জনপ্রিয়তা ও মানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রযোজনা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি অশ্লীলতা পরিহার করে রুচিশীল ও পারিবারিক উপযোগী পরিবেশনা নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
তিনি আরও বলেন, যাত্রা শিল্পকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করতে হলে বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা দরকার।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন আহমেদ স্বাগত বক্তব্য দেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে সাংবাদিক জোবায়ের বাবুও উপস্থিত ছিলেন। তারা যাত্রা শিল্পের ঐতিহ্য রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ২০০-রও বেশি যাত্রা শিল্পী ও দলনেতা অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা, সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা তুলে ধরেন। অনেকেই বলেন, সঠিক নীতি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক প্রণোদনা পেলে যাত্রা শিল্প আবারও তার হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে পারে।
বক্তারা মনে করেন, আধুনিকায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি সহায়তার সমন্বয়ে যাত্রা শিল্পকে নতুনভাবে প্রাণবন্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত করার সুযোগ রয়েছে, যদি পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়।