কেন বনলতা এক্সপ্রেস বন্ধ করা হল প্রশ্ন রুমিন ফারহানার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বনলতা এক্সপ্রেস ছবিটির প্রদর্শনী স্থগিত করার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন ক্ষুব্ধ জনতা। সোমবার মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা দ্রুত বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমাটি প্রদর্শনী পুনরায় চালুর দাবি জানান। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বনলতা এক্সপ্রেস বন্ধ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।বক্তরা বলেন, বনলতা এক্সপ্রেস একটি পারিবারিক চলচ্চিত্র । এর প্রদর্শনী বন্ধ করা সংস্কৃতি চর্চার পথে বড় বাধা।
সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে মৌলবাদী শক্তি: রুমিন
মানববন্ধনে রুমিন ফারহানা বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ যেমন কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর ছিল না। তেমনি ২০২৪ সালের গণআন্দোলনও ছিল দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন। তিনি বলেন, কেউ যদি গণআন্দোলনের কৃতিত্ব নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চায়, তাহলে তার পরিণতি শুভ হবে না।

রুমিন ফারহানা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয়ে থাকে। অথচ এখানে একটি সিনেমা হলও নেই। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। তার ভাষায়, যারা বাংলাদেশকে পিছিয়ে নিতে চায় এবং মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারাই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
বনলতা এক্সপ্রেস বন্ধের কারণ নিয়ে প্রশ্ন
বক্তব্যে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি পারিবারিক সিনেমার প্রদর্শনী কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো। তিনি বলেন, যে রাষ্ট্র শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, খুন, দুর্নীতি কিংবা অর্থ পাচারের মতো অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সেই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি সিনেমা বন্ধে সমর্থন দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থানের বাংলাদেশ
রুমিন ফারহানা বলেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি সব সময় বৈচিত্র্য ও সহনশীলতার প্রতীক ছিল। এই দেশে যেমন ধর্মীয় চর্চা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সংগীত, সাহিত্য ও লোকজ সংস্কৃতির চর্চা। তিনি বলেন, আজানের ধ্বনির পাশাপাশি বাউল গান এবং কোরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি সংগীত শিক্ষার পরিবেশও এই দেশের ঐতিহ্যের অংশ।

নতুন প্রজন্মকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়ার শঙ্কা
তিনি আরও বলেন, সংস্কৃতি চর্চা বন্ধ করে দিলে নতুন প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। তার মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একসঙ্গে চলতে পারে। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যও সেটিই প্রমাণ করে। তাই সংস্কৃতির ওপর বাধা সৃষ্টি করা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।
বক্তব্যের শেষাংশে রুমিন ফারহানা বলেন, যারা আজ সংস্কৃতি চর্চার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, ভবিষ্যতে তারাই এর নেতিবাচক প্রভাব অনুভব করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্টদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কোনো উদ্যোগ সফল হবে না।
বনলতা এক্সপ্রেস পুনরায় চালুর দাবি
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন জেলা উদিচির সাধারণ সম্পাদক ও উপদেষ্টা ফেরদৌস রহমান, সরাইল উদিচির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইফতেখার জাবেদ এবং সোনালী সকালের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মুনতাসিরসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের বিভিন্ন নেতাকর্মী। তারা সবাই বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনী পুনরায় চালুর দাবি জানান।

কেন বন্ধ করা হয় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী?
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনীর স্থগিত জন্য কওমি শিক্ষার্থীদের একাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালায়। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি সিনেমাটির প্রদর্শনী স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতা হাফেজ নাসুরুল্লাহ মুয়াজ নিজের ফেসবুক পোস্টে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনীর ফটোকার্ডে লাল ক্রসচিহ্ন দিয়ে এর বিরোধিতা করেন। তিনি পোস্টে দাবি করেন, এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।
এ বিষয়ে জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তারেক জামিল বলেন, জেলায় কোনো ধরনের ‘অশ্লীলতার’ প্রদর্শন তারা চান না। তার দাবি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কোনো সিনেমা হল নেই। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হল সংস্কৃতির অবসান ঘটানো হয়েছে। তাই সেই পরিবেশ আবার ফিরে আসুক, সেটিও তারা চান না।

তবে প্রদর্শিত সিনেমায় কোনো ‘অশ্লীলতা’ না থাকলেও আপত্তি থাকবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক জামিল বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংগঠনের সিনিয়র নেতারাই ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।
ফলে স্থানীয় ধর্মভিত্তিক সংগঠনের আপত্তি, সিনেমা প্রদর্শনের বিরোধিতা এবং জেলার সামাজিক-ধর্মীয় পরিবেশ রক্ষার যুক্তিকেই ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
মানববন্ধন ঘিরে নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা
মানববন্ধনকে কেন্দ্র করে বিকেল ৩টার পর থেকেই শাহবাজপুর প্রথম গেট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন ম্যাজিস্ট্রেটও দায়িত্ব পালন করেন।