ইশতেহারে শিল্প-সংস্কৃতি
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা দিয়েছে। উভয় দলের ইশতেহারেই রয়েছে শিল্প ও সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ অধ্যায় ও ভাবনা। দু’দলই তাদের ইশতেহারে সংস্কৃতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে তুলনামূলকভাবে জামাতের ইশতেহারে এসেছে অনেক কথা। যেখানে বিএনপির ইশতেহার কিছুটা সংক্ষিপ্ত। দু’দলের “সংস্কৃতি” ভাবনার ভাষা, উদ্দেশ্য আর দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় কাছাকাছি মনে হলেও আসলে এক নয়। চলুন দেখে নেয়া যাক বিএনপি ও জামায়াতের ইশতেহারে সংস্কৃতি ভাবনা- কে বেশি গণতান্ত্রিক?
বিএনপি কী বলছে?
বিএনপির ইশতেহারে সংস্কৃতি এসেছে “ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি” অধ্যায়ের ভেতরে। তারা মূলত জোর দিয়েছেত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, জাতীয় ঐতিহ্যের সাথে সংগতি, ও বৈচিত্র্যের বিকাশে।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঠেকানো তথা আকাশ-সংস্কৃতি, অনৈতিক প্রভাব, অপসংস্কৃতি রোধের কথা বলেছে। এছাড়াও রয়েছে জাতীয় ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা এবং বাধা সরানো হবে বলে উল্লেখ্য করেছে। স্কুল-কলেজে সংস্কৃতি চর্চাকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁরা বলছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুস্থ বিনোদন ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ বাড়ানোর কথা। এছাড়াও আরও একটা বিষয় তারা আলাদা করে বলেছে যা হল জাতীয় পদকের পরিসর বাড়ানোর কথা। মানে সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতি। যার উদাহরণ হিসেবে তারা বলছে যে বিএনপির হাত ধরে বাংলাদেশে স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক ইত্যাদি জাতীয় পুরস্কার প্রবর্তিত হয়েছিল।
বিএনপির এই ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে যেটা পাওয়া যায় তা হল- অনৈতিক বিদেশী-সংস্কৃতি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করার কথা। তবে একই সাথে বিদেশী সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার কথাও রয়েছে। তাদের কথায়, ‘বহিঃর্বিশ্বের যা কিছু শুভ ও কল্যাণময় সে সব উপাদান জাতীয় সংস্কৃতির সংগে সমন্বিত করা হবে।‘
এছাড়াও জাতীয় ঐতিহ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ শিল্প-কর্মের বিষয়গুলো যেমন সঙ্গীত, নৃত্য-কলা, নাটক, সাহিত্য চর্চা, চলচ্চিত্রসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানকে সীমাবদ্ধ না করে আরো সমৃদ্ধ করার কথা। গণতান্ত্রিক ও বৈচিত্র্যময় পদ্ধতি ও সমাজ উপাদানকে আরো ফুটিয়ে তোলার কথা।
এছাড়াও তারা বলছে, ‘সংস্কৃতির মাধ্যমে স্বাধীন চিন্তাধারা ও মতাদর্শের যেন সুষ্ঠু প্রতিফলন হয় তার জন্য গণতান্ত্রিক রীতি পদ্ধতির অনুসরণ করা হবে।‘ অর্থাৎ যেকোন জাত কিংবা গোষ্ঠীর কিংবা যে কোন মতাদর্শের সাংস্কৃতিক বিকাশে তারা সহায়তা করবে।
বিএনপির ভাষায় “জাতীয় ঐতিহ্য” ও “গণতান্ত্রিক চর্চা” এবং জাতীয় বৈচিত্র্যের প্রতি সহনশীলতা ও উদার মনোভাব পরিলক্ষিত হয়।
জামায়াত কী বলছে?
জামায়াত তাদের সংস্কৃতি ভাবনা নিয়ে কথা বলেছে “মানবসম্পদ ও জনজীবনের মৌলিক মানোন্নয়ন” অংশে। তাদের বক্তব্য একটু ভিন্ন রকম। সংস্কৃতিকে তারা দেখছে নীতিমালা ও কাঠামোর মধ্যে।
সুদূর অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই জনপদের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসকে দালিলিকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার জন্য যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ এই জনপদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের যথাযথ দলিল সংরক্ষণ করবে যা একটি জনপদের জন্য খুবই দরকারী বিষয়। তাঁর ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে।
এছাড়াও ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগও তারা নিবেন বলে জানিয়েছে।
জামাত বলছে, বিভিন্ন ঐতিহাসিক দিনগুলোকে স্মরণীয় করার লক্ষ্যে বিশেষ দিবসের প্রত্যাবর্তন তারা করবে। এই দিবসগুলোকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়ও পালনের ব্যবস্থা করা হবে। এ নিয়ে তারা শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক গবেষক নিয়ে জাতীয় সাংস্কৃতিক কমিশনও গঠন করবেন। তবে এখানে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ্য করেনি তারা যে সেই ঐতিহাসিক দিনগুলো কি এবং বিদ্যমান ঐতিহাসিক দিবস গুলোর বাহিরে আরো কি কি দিবস থাকতে পারে। ব্যাপারটা পুরোপুরি বিমূর্ত যেখানে অনেক বিতর্কিত ইতিহাসকে তুলে আনার প্রবণতা ও চেষ্টা লক্ষ্যণীয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন ২১টি প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।
জামায়াতের বিমূর্ত ভাবনা
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এবং কিছুটা চিন্তা উদ্রেককারী হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে তা হল তাদের কাঠামোবদ্ধ চিন্তার প্রতিফলন। তারা বলছে, “দেশের জনগণের বোধ-বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হবে। অশ্লীলতা পরিহার এবং যেকোনো ধর্মের প্রতি অবমাননাকর উপস্থাপনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হবে।
এই ধারার দুটি বিতর্কিত বিষয় হল অশ্লীলতা ও ধর্ম অবমাননার বিষয়টি। প্রথমত, এই দুটি বিষয়ই বিমূর্ত। অশ্লীলতা সার্বজনীন রূপ কেমন তাঁর নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা কিংবা রূপ কেমন তা নিয়ে ঐতিহাসিকভাবেই বিতর্ক রয়েছে। এছাড়া ধর্ম অবমাননার বিষয়টিও বেশ চিন্তা উদ্রেককারী। কেননা ক্ষমতাযন্ত্র তাদের বিশ্বাসের সাথে কোনকিছু সাংঘর্ষিক মনে হলে তাতে ধর্ম অবমাননা শ্রেণীকরণ করার প্রবণতা রয়ে যায়। এছাড়াও, এটি স্বাধীন চলচ্চিত্র, নাটক কিংবা লিখিত ও ভিজ্যুয়াল শিল্পের জগতে সৃজনশীলতার বিরুদ্ধে একধরনের সীমাবদ্ধকরনেরও হাতিয়ার হিসেবে উপস্থিত হতে পারে।
তবে, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের অবদানের ভিত্তিতে সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পেনশন ব্যবস্থা চালু করা এবং দুস্থ ও প্রতিভাবান শিল্পীদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত শিল্পীকল্যাণ তহবিল বাজেট বৃদ্ধি করার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়।
সব মিলিয়ে জামায়াতের ভাষায় সবচেয়ে জোরালো শব্দ-“বোধ-বিশ্বাস”, “নীতি”, “নিষেধ”, “সংরক্ষণ” ও সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো।
তাহলে মূল পার্থক্যটা কোথায়?
বিএনপি সংস্কৃতিকে দেখছে একটা সার্বজনীন জাতীয় পরিচয় গঠন ও এর বিকাশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারা অব্যাহত রাখতে সাহায্য করা যেখানে কোন কাঠামোবদ্ধ সীমাবদ্ধকরণ নেই। অন্যদিকে জামায়াত সংস্কৃতিকে দেখছে একটি আদর্শিক কাঠামো ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিষয় হিসেবে। যেখানে অনেক কিছুই, মূলত সবকিছুই তাদের বিশ্বাস ও মতাদর্শের ছাচের মধ্য দিয়ে গিয়ে গড়ে উঠবে কিংবা সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে শিল্পীদের আর্থিক সহযোগিতায় বেশ এগিয়ে রয়েছে দলটির ইশতেহার।
পরিশেষে বলতে হয়, ইশতেহারে “সংস্কৃতি” শব্দটা একই হলেও, ভিতরের মানে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। এক দল বলছে-সংস্কৃতিকে আরও “গণতান্ত্রিকভাবে” এগোতে দিতে হবে। আরেক দল বলছে-সংস্কৃতিকে “নীতি-নৈতিকতা” দিয়ে শাসিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। এই ইশতেহারে তাই মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের হিন্দু-মুসলমান প্রবন্ধের একটি কথা যেখানে তিনি বলেছেন,” আমাদের মানসপ্রকৃতির মধ্যে যে অবরোধ রয়েছে তাকে ঘোচাতে না পারলে আমরা কোনোরকমের স্বাধীনতাই পাব না। শিক্ষার দ্বারা, সাধনার দ্বারা সেই মূলের পরিবর্তন ঘটাতে হবে-ডানার চেয়ে খাঁচা বড়ো এই সংস্কারটাকেই বদলে ফেলতে হবে-তার পরে আমাদের কল্যাণ হতে পারবে।“।


