নির্মাতা বেলা তার
হাঙ্গেরির কিংবদন্তী নির্মাতা বেলা তার মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তিনি ‘ড্যামনেশন’,‘স্যাতানতাঙ্গো’,’তুরিন হর্সের মতো বিষণ্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নৈঃশব্দের প্রতিপালক। আজ মঙ্গলবার সকালে ইউরোপীয় চলচ্চিত্র একাডেমি তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতায় ভুগে আজই বিদায় নিয়েছেন এই সিনেমা মায়েস্ত্রো। খবর ভ্যারাইটি।

ইউরোপীয় চলচ্চিত্র একাডেমি এক বিবৃতিতে জানায়, ‘আমরা একজন অসাধারণ নির্মাতাকে হারালাম। যার শক্তিশালী রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর আমাদের ভাবিয়েছে। তিনি শুধু সহকর্মীদের কাছেই গভীরভাবে সম্মানিত ছিলেন না, বিশ্বজুড়ে দর্শকদের কাছেও ছিলেন সমাদৃত। শোকাহত পরিবার সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে এই কঠিন সময়ে তাদের অবস্থান বোঝার অনুরোধ জানিয়েছে। পরিবার এখনই কোনো বক্তব্য দেবে না।’
বেলা তার ছিলেন ‘ধীরগতির সিনেমা’ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। এই ধারার বৈশিষ্ট্য ছিল—সাদা-কালো চিত্রগ্রহণ, দীর্ঘ ও অবিচ্ছিন্ন শট, অত্যন্ত সীমিত সংলাপ, প্রচলিত কাহিনিনির্ভর গল্প বলার কাঠামো এড়িয়ে ভিন্ন বাস্তবতা নির্মাণ। তার সিনেমা পূর্ব ইউরোপের দৈনন্দিন জীবনের নিঃসঙ্গতা, নীরবতা, আনন্দহীন বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে।

তার এই চলচ্চিত্রভাষার নজির দেখা যায় ১৯৯৪ সালে নির্মিত ‘স্যাতানতাঙ্গো’ চলচ্চিত্রে। সাড়ে সাত ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের এ ছবিতে কমিউনিজম পতনের পর একটি ছোট হাঙ্গেরীয় গ্রামের মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়।
দৈর্ঘ্যের কারণে ছবিটি সহজে দর্শকপ্রিয় না হলেও সমালোচকদের কাছে এটি বেলা তারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য স্থান করে নেয়।

কিংবদন্তী নির্মাতা বেলা এর হাতে নীটশের ঘোড়া
এরপর আছে তার আরেক বিখ্যাত বিষণ্ণ সিনেমা দ্য তুরিণ হর্স। মানুষ, সময় ও অস্তিত্ব সংকটের এক গভীর দার্শনিক নির্মাণ। প্রচলিত আছে ১৮৮৯ সালে ইতালীর তুরিণ শহরে দার্শনিক ফ্রেড্রিখ নীটশে এক ঘোড়াকে প্রহারিত হতে দেখে তাকে জড়িয়ে ধরেন, কাঁদেন, এরপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
সিনেমাটি সেই ঘোড়া, তার মালিক ও তার মেয়ের জীবনের সাত দিনের গল্প বলে। পুরো সিনেমায় প্রায় কিছুই ঘটে না। প্রতিদিন একই কাজ, একই খাবার আর একই নীরবতা, একই নিয়তি।

সাদা-কালোয় লং টেক, খুবই অল্প ডায়ালগের সাথে ভারী সাউন্ড ডিজাইন আর মরুময় তুষারাবৃত স্থান ও জীবনের স্বাদহীনতার ভিতর দিয়ে এক অদ্ভুত বিষণ্ণটা ভর করে পুরো সিনেমায়। দেখায় এখানে কোনো মুক্তি নেই, কোনো অলৌকিকতা নেই, কেবল সময়ের বয়ে যাওয়া। আছে কেবল জীবনকে বয়ে বেড়ানো।
২০১১ সালে সিনেমাটি মুক্তি পায়। এই সিনেমার মুক্তির পরে বেলা তার আর কোন সিনেমা বানাননি। তিনি বলেছিলেন যে তার আর কিছুই বলার নেই।