৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব
এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইতিহাস গড়েছে আফ্রিকান সিনেমা । আফ্রিকার দুজন নবীন চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রথমবারের মতো এই মর্যাদাপূর্ণ কান উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশন অ্যাঁ সার্তে রিগা বিভাগে জায়গা পেয়েছে।
রুয়ান্ডার নবাগতা অভিনেত্রী মারি-ক্লেমেন্টিন দুসাবেজাম্বো তার গণহত্যা-পরবর্তী নাটক “বেন’ইমানা” এবং মধ্য আফ্রিকার চলচ্চিত্র নির্মাতা রাফিকি ফারিয়ালা তার বয়ঃসন্ধিকালীন সিনেমা “কঙ্গো বয়” নিয়ে ‘অ্যাঁ সার্তে রিগা’ বিভাগে প্রিমিয়ার হতে যাচ্ছে। ভ্যারাইটি অবলম্বনে।
রাফিকি ফারিয়ালার সিনেমা যাত্রা
রাফিকি ফারিয়ালা ২০২২ সালে তাঁর প্রামাণ্যচিত্র উই,স্টুডেন্টস এর মাধ্যমে সবার নজর আসেন। এটি ছিল মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যা বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়।
এবার তিনি কানে আসছেন এক গভীর আত্মজৈবনিক গল্প নিয়ে। তাঁর নতুন এই চলচ্চিত্রে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত এক দেশে গায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখা এক তরুণ কঙ্গো শরণার্থীর জীবনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
মধ্য আফ্রিকার বাংগুইতে প্যারিস-ভিত্তিক আতেলিয়ে ভারান পরিচালিত একটি কর্মশালায় প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা থেকেই ফারিয়ালা নির্মাণ করেন কঙ্গো বয়। ছোটবেলায় তাঁর পরিবার কঙ্গো ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল, আর সেই অভিজ্ঞতার ছাপই উঠে এসেছে এই সংগীতশিল্পীর গল্পে।

যদিও তাঁর আশ্রয় নেওয়া মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত, তবু ফারিয়ালার তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র কোথায় শুট করবেন, তা নিয়ে কোনো সন্দিহান ছিলেন না। তিনি ভ্যারাইটিকে বলেন, “আমার জন্য বাঙ্গুইতেই শুটিং করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”
চলচ্চিত্রটির অনেক ক্রু সদস্য এসেছেন সিনেবাংগুই থেকে, তাঁকে এসময় সমর্থন দিয়েছিলো লিয়নের সিনেফ্যাব্রিক ফিল্ম স্কুল। ছবির পুরো অভিনয়শিল্পী দলই ছিলেন অপেশাদার অভিনেতা। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা ব্র্যাডলি ফিওমোনাকে খুঁজে বের করেন ফরাসি কাস্টিং পরিচালক অ্যালিন ডালবিস, একটি স্ট্রিট কাস্টিং কলের মাধ্যমে।
এমনকি কঙ্গো বয়–এ রাস্তার চেকপোস্টে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা ক্লাবে গুলি চালানো কিশোরদের ভূমিকাতেও অভিনয় করেছেন বাস্তব জীবনের সৈনিকেরা। ফারিয়ালার ভাষায়, ক্যামেরার সামনে তাঁদের উপস্থাপনা সত্যিকার অর্থেই তাঁর ভালো লেগেছিল।
কঙ্গো বয় ছিল চারটি দেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্র। এটির নেতৃত্বে ছিল বাঙ্গু–ভিত্তিক মাকোঙ্গো ফিল্মস। ফারিয়ালার মতে, এটি স্ক্রিপ্ট থেকে পর্দায় আসা পর্যন্ত ছিল “একটি দীর্ঘ যাত্রা”।
তবুও তিনি দৃঢ়ভাবে চেয়েছিলেন দর্শকরা যেন শরণার্থীদের নতুনভাবে দেখতে শেখে। নিজের জীবনের গল্পকে তিনি উপস্থাপন করেছেন এই বিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে যে, “অন্ধকারের শেষেই একটি আলো আছে।”
‘বেন’ইমানা নির্মাণের গল্প
অন্যদিকে ৩৯ বছর বয়সী অ্যাপোলাইন ট্রাওরে (দুসাবেজাম্বো) এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে পৌঁছানো ছিল একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফল। তার যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় ২০ বছর আগে, যখন সদ্য কলেজ স্নাতক হিসেবে তিনি যুক্ত হন ‘অ্যালমন্ড ট্রি’ চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সাথে, যা রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালি’তে অবস্থিত। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা লি আইজ্যাক চুং, যার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “মুনিউরাঙ্গাবো” শুট করা হয়েছিল রুয়ান্ডায়।
চুংয়ের তত্ত্বাবধানে কাজ করার সময়ই ডুসাবেজাম্বো নির্মাণ করেন ‘লাইজা’ যা প্রথমবারের মতো ট্রাইবেকা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। এটি তাকে রুয়ান্ডার গণহত্যা ও তৎপরবর্তী প্রভাব নিয়ে ধারাবাহিক চলচ্চিত্র নির্মাণের পথে সাহস যোগায় ।

বেন’ইমানা সিনেমাকে বাস্তবে রূপ দিতে ডুসাবেজাম্বোকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগ্রাম করতে হয়েছে।
ডেলফিন আগুতের সাথে যৌথভাবে রচিত এই চলচ্চিত্রটি কান-এর লা ফাব্রিক সিনেমা, মারাকেশ চলচ্চিত্র উৎসবের অ্যাটলাস ওয়ার্কশপস এবং ওয়াগা ফিল্ম ল্যাব-সহ বিভিন্ন ল্যাব ও রেসিডেন্সিতে নির্মিত হয়েছিল।
অবশেষে এটি একটি আফ্রিকান যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত, যা রুয়ান্ডার এজো সিনে.লিমিটেড এবং গ্যাবনের প্রিন্সেস এম প্রোড দ্বারা ফ্রান্সের লে ফিল্মস ডু বিলবোকেট এবং নরওয়ের ডুও ফিল্মের সাথে যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে।
মাতৃভাষায় সিনেমা নির্মাণ
সিনেমাটি ভিন্ন ভাষায় নির্মাণ করার কথা বলেছিলেন প্রযোজকেরা। দুসাবেজাম্বো এ নিয়ে বলেন, তিনি তাঁর মাতৃভাষা কিনিয়ারওয়ান্ডার পরিবর্তে ফরাসি বা ইংরেজিতে চলচ্চিত্রটি নির্মাণের জন্য অর্থদাতাদের চাপকে উপেক্ষা করেছিলেন।
ডুসাবেজাম্বো জানান, অর্থায়নকারীরা যখন চাপ দিচ্ছিলেন চলচ্চিত্রটি ফরাসি বা ইংরেজিতে করার জন্য, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজের মাতৃভাষা কিনিয়ারওয়ান্ডাতেই নির্মাণ করবেন।
তার ভাষায়, “আমি কখনোই এই চলচ্চিত্রকে অন্য কোনো ভাষায় কল্পনা করতে পারিনি। আমি সত্যিই চাইছিলাম শব্দগুলোর ভার অনুভব করাতে।”
তিনি আরও বলেন, অর্থায়নের জটিল ব্যবস্থার কারণে সময় লেগেছে, কিন্তু তিনি চলচ্চিত্রের হৃদয় ও আত্মা হারাতে চাননি।
শেষ পর্যন্ত বেন’ইমানা’র কাস্ট প্রায় পুরোপুরি অপেশাদার অভিনেতাদের নিয়ে গঠিত হয়, এবং ডিরেক্টরের ভাষায় এর ৯০% ক্রু ছিলেন রুয়ান্ডান এবং ১০০% আফ্রিকান।


