কিছু পাওয়ার জন্য সংগীত নয়, গান করতে হবে নিজের ভালো লাগা ও প্রশান্তির জন্য। সংগীত জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে এমনই মন্তব্য করেছেন নগরবাউল জেমস। তাঁর মতে, সংগীতের মাধ্যমে কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলে শিল্পীর উচিত সেই জায়গা থেকেই সরে আসা।
ইতালির ভেনিসে কনসার্ট শেষ করে বর্তমানে সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থান করছেন জেমস। ৬ সেপ্টেম্বর, শহরটির নাকা এলাকায় একটি কনসার্টে গান পরিবেশন করবেন এই রক তারকা। এর আগে কনসার্ট উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিজের সংগীতজীবন, নতুন গান, লাইভ মিউজিক, প্রযুক্তি এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে কথা বলেন তিনি।

নিজের প্রশান্তির জন্যই সংগীত
দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য শ্রোতার ভালোবাসা পেয়েছেন জেমস। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও নিয়মিত কনসার্ট করছেন তিনি। তবে এত অর্জনের পরও সংগীতকে কখনো কোনো কিছু পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি এই শিল্পী।
শিল্পী বলেন, ‘কোনো কিছু পাওয়ার জন্য মিউজিক বা সংগীত করা যাবে না। এর বাইরে কোনো কিছু চাওয়ার থাকলে এখনই মিউজিক বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ, মিউজিক করতে হবে নিজের প্রশান্তির জন্য।’
তাঁর কথায়, সংগীতের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটা মূলত ভালোবাসার। জনপ্রিয়তা, অর্থ কিংবা অন্য কোনো অর্জন যদি সংগীতের সঙ্গে আসে, সেটি বাড়তি পাওয়া। কিন্তু সেটিকে মূল লক্ষ্য বানানো উচিত নয়।
শিল্পী আরও বলেন, ‘এর মাধ্যমে যদি কিছু অর্জন হয়, সেটা ভিন্ন কথা। আজ যদি আমি কোনো কিছু নাও পেতাম, তাহলেও গানই করে যেতাম।’
লাইভ মিউজিকের বিকল্প নেই
শিল্পীর সংগীতজীবনের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে সরাসরি মঞ্চে পরিবেশনা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কনসার্টে তাঁর গান শুনতে ভিড় করেন শ্রোতারা। তাঁর কাছে লাইভ মিউজিক শুধু গান পরিবেশনের বিষয় নয়, বরং শিল্পী ও শ্রোতার সরাসরি যোগাযোগের একটি জায়গা।
বর্তমানে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে সংগীত তৈরির ধরনও বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের গান। বিষয়টি নিয়েও নিজের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন তিনি ।
তিনি বলেন, ‘এখানে পারফেকশন অনেক বেশি। এআই দিয়ে নির্মাণ করা গানগুলো প্রথমে শুনতে একটু ভালো লাগে, কিন্তু পরে বোর লাগে।’
শিল্পীর মতে, প্রযুক্তি সংগীত তৈরিতে অনেক কিছু সহজ করে দিতে পারে। শব্দ, সুর কিংবা পরিবেশনার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। কিন্তু মানুষের তৈরি লাইভ মিউজিকের যে আবেগ, সেটি প্রযুক্তি দিয়ে পুরোপুরি তৈরি করা কঠিন।
এআইনির্ভর সংগীত নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লাইভ পারফরম্যান্সের গুরুত্বও তুলে ধরেন শিল্পী।
তাঁর ভাষায়, ‘এছাড়া মানুষ এখানে লাইভ কনসার্টের যে মজা, সেটা পাবে না। এটা জীবনের মতোই সুন্দর।’
শিল্পীর মতে, মঞ্চে গান গাওয়ার সময় শ্রোতার প্রতিক্রিয়া, মুহূর্তের আবেগ এবং শিল্পীর সঙ্গে দর্শকের সরাসরি যোগাযোগ-সব মিলিয়েই লাইভ মিউজিকের সৌন্দর্য। রেকর্ড করা বা প্রযুক্তিনির্ভর সংগীত সেই অভিজ্ঞতার পুরোটা দিতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত গান করে যেতে চান জেমস
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিষ্কার কথা বলেছেন জেমস। সংগীত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা বা নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে এগোচ্ছেন না তিনি। বরং যতদিন সম্ভব গান করে যেতে চান।
জেমস বলেন, ‘আমার মিউজিক নিয়ে কোনো ফিউচারের কথা আমি ভাবি না। জীবনের শেষ পর্যন্ত মিউজিক করে যাব।’
শ্রোতা যত কমই থাকুক, গান থামানোর ইচ্ছা নেই তাঁর। এ প্রসঙ্গে জেমসের বক্তব্য, ‘যদি দেখি একজন দর্শক আছে, তাহলেও মিউজিকই করে যাব।’
এই কথাতেই সংগীতের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের দায়বদ্ধতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনপ্রিয়তা কিংবা শ্রোতার সংখ্যা নয়, গান করাটাই তাঁর কাছে মুখ্য।
নতুন শিল্পীদের নিয়ে আশাবাদী জেমস
সংগীতের নতুন প্রজন্ম নিয়েও আশাবাদী জেমস। তাঁর মতে, দেশে নতুন অনেক শিল্পী ও ব্যান্ড তৈরি হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে প্রতিভাবান অনেকেই রয়েছেন, যারা ভবিষ্যতে সংগীতাঙ্গনে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারেন।
নতুনদের গান শোনার জন্য শ্রোতাদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পুরোনোদের পাশাপাশি নতুন শিল্পীদের কাজকেও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন এই রক তারকা।
ইউরোপ সফরের অংশ হিসেবে ইতালির ভেনিসে কনসার্টের পর এবার সুইডেনের স্টকহোমে গান পরিবেশন করবেন জেমস। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে তাঁর এই পরিবেশনা ঘিরে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে আগ্রহ।
তবে কনসার্টের ব্যস্ততার মধ্যেও জেমসের বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে একই দর্শন-সংগীত কোনো কিছু পাওয়ার সিঁড়ি নয়। ভালোবাসা, আনন্দ ও নিজের প্রশান্তির জন্যই সংগীত। আর সেই বিশ্বাস নিয়েই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গান করে যেতে চান নগরবাউল।







