পাঁচ বছর ধরে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন উপস্থাপক সামিয়া আফরিন। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর একসময় তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আসে। স্বাভাবিক জীবনেও ফিরেছিলেন তিনি। তবে সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। প্রায় তিন মাস আগে নতুন করে তাঁর শরীরে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার শনাক্ত হয়। পরীক্ষায় এবার ওভারিয়ান ক্যানসার ধরা পড়ে। দ্রুত অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে পরীক্ষার ফলাফলে টিউমারটি ‘হাই-গ্রেড কার্সিনোমা’ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
বর্তমানে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেমোথেরাপি নিচ্ছেন সামিয়া। ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ এই লড়াইয়ে চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক শক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।

শরীরে দ্বিতীয় ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ধরা পড়েছে: সামিয়া
রোববার নিজের ফেসবুক পোস্টে নতুন করে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা জানান সামিয়া। তিনি জানান, মাত্র তিন মাস আগে তাঁর শরীরে দ্বিতীয় ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ধরা পড়ে। এরপর দ্রুত অস্ত্রোপচার করাতে হয়। পরীক্ষার ফলাফলে টিউমারটি হাই-গ্রেড কার্সিনোমা হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে এখন কেমোথেরাপি নিতে হচ্ছে তাঁকে।
এবারের চিকিৎসা সামিয়ার জন্য আগের চেয়ে আলাদা। প্রথমবার ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর তাঁকে কেমোথেরাপি নিতে হয়নি। ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে চলেছিল চিকিৎসা। তাই কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে এবার নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে।
চুল পড়ে যাওয়াকেও ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন
কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় চুল পড়ে যেতে পারে চিকিৎসকদের কাছ থেকে আগেই জেনেছিলেন সামিয়া। তাই বিষয়টি নিয়ে ভেঙে না পড়ে আগেভাগেই নিজের চুল ছোট করে ফেলেছেন তিনি।
সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে সামিয়া জানান, কঠিন পরিস্থিতিকেও নিজের মতো করে গ্রহণ করতে চান। তাঁর কাছে চুল পড়ে যাওয়া নিয়ে মন খারাপ করার চেয়ে সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সামিয়ার বলেন, সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে কোনো লাভ নেই। পরিস্থিতি বদলালে তার সঙ্গে নিজেকেও মানিয়ে নিতে হয়। চুল ছোট করার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেই মানসিক দৃঢ়তাই প্রকাশ করেছেন তিনি।

২০২২ সালে শুরু হয়েছিল ক্যানসারের লড়াই
সামিয়া আফরিনের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শুরু হয় ২০২২ সালে। ওই বছরের এপ্রিলে শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে পরীক্ষা করান তিনি। পরীক্ষায় শরীরে টিউমার ধরা পড়ে। এরপর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান সামিয়া।
সেখানে বিস্তারিত পরীক্ষার পর জানতে পারেন, তিনি কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত। ততদিনে রোগটি চতুর্থ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছিল ফুসফুস ও লিম্ফ নোডেও।
এই খবর স্বাভাবিকভাবেই বড় ধাক্কা হয়ে এসেছিল তাঁর জীবনে। শুরুতে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন চিকিৎসার কথা বলেছিলেন। এসবের ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি মেনে নিতে না পেরে একপর্যায়ে চিকিৎসা না নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন সামিয়া।
পরে সিঙ্গাপুরের একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাঁকে ইমিউনোথেরাপির পরামর্শ দেন। নির্দিষ্ট বিরতিতে চলতে থাকে সেই চিকিৎসা। ব্যয়বহুল এই চিকিৎসাপদ্ধতির ওপরই শেষ পর্যন্ত ভরসা রাখেন তিনি।
অসুস্থতাকে কাজের পথে বাধা হতে দেননি
ইমিউনোথেরাপির প্রথম কয়েক মাস সামিয়ার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। চিকিৎসার পর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়তেন তিনি। কখনো মাত্র কয়েক কদম হাঁটার শক্তিও থাকত না। শরীর কাঁপত, ত্বকেও নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিত।
তারপরও অসুস্থতাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চাননি সামিয়া। চিকিৎসার পাশাপাশি অফিস করেছেন। কাজ করেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন।
কখনো চিকিৎসার ডোজ নেওয়ার পর বাসায় ফিরে অল্প সময় বিশ্রাম নিয়ে বন্ধুদের আড্ডাতেও যোগ দিয়েছেন। তাঁর কাছে অসুস্থতার কারণে জীবন থামিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান ছিল না। বরং যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনযাপন করার চেষ্টা করেছেন তিনি।
ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার খবরও দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে আনেননি সামিয়া। পরিবার ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু ছাড়া বিষয়টি তেমন কেউ জানতেন না। কারণ, অসুস্থতার কারণে মানুষের বাড়তি সহানুভূতি নিতে চাননি তিনি।
দুই বছর পর ফিরেছিলেন স্বাভাবিক জীবনে
দীর্ঘ দুই বছরের চিকিৎসা কোর্স শেষ হওয়ার পর সামিয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হতে শুরু করে। একসময় নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজনও কমে আসে। চিকিৎসকেরাও আশাবাদী ছিলেন, ক্যানসার আর ছড়িয়ে পড়ছে না।
সামিয়াও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেন। কাজ করেছেন, ব্যস্ত থেকেছেন এবং আগের মতো জীবন উপভোগ করার চেষ্টা করেছেন। সেই সময় তিনি জানিয়েছিলেন, ক্যানসারের জীবাণু আর ছড়িয়ে পড়ছে না এবং যা ছিল, সেটিও সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে।
কিন্তু কয়েক মাস আগে আবারও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। দ্বিতীয়বার ম্যালিগন্যান্ট টিউমার শনাক্ত হওয়ার পর শুরু হয়েছে নতুন চিকিৎসা। এবার ইমিউনোথেরাপির পরিবর্তে কেমোথেরাপি নিতে হচ্ছে তাঁকে।

সামিয়ার পাশে থাকার আহ্বান
নতুন এই লড়াইয়ের শুরুতেই সামিয়া বুঝিয়ে দিয়েছেন, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, মানসিক শক্তি হারাতে চান না। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় চুল পড়ে যেতে পারে এই বাস্তবতাকেও তাই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছেন তিনি।
ক্যানসারের এই পথ কতটা কঠিন, সেটি যারা নিজেরা পার করেছেন তারাই সবচেয়ে ভালো বোঝেন বলে মনে করেন সামিয়া। একই সঙ্গে তিনি চান না, তাঁর কাছের কোনো মানুষকে কখনো এমন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হোক।
শেষে সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন এই উপস্থাপক। তাঁর প্রত্যাশা, আল্লাহ যেন চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ করে দেন এবং আগের মতো এবারও তাঁকে মানসিক শক্তি ধরে রাখার সামর্থ্য দেন। দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান সামিয়া।
নতুন লড়াইয়ে তাঁর এই ইতিবাচক মানসিকতাই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি। চিকিৎসার কঠিন সময়ের মধ্যেও নিজের মতো করে জীবনকে গ্রহণ করার চেষ্টা করছেন তিনি। চুল ছোট করে নতুন লুক নেওয়ার সিদ্ধান্তটিও যেন সেই বার্তাই দিচ্ছে পরিস্থিতি বদলালেও সাহস হারানো যাবে না, সামনে এগিয়ে যেতে হবে।



