দেখতে দেখতে নায়করাজ রাজ্জাকহীন পেরিয়ে গেল ৯টি বছর। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের হৃদয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা যেন সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে। পর্দায় তাঁর হাসি, সংলাপ, অভিব্যক্তি কিংবা কোনো গানের দৃশ্য সবকিছুতেই আজও ফিরে আসে এক স্বর্ণালি সময়ের স্মৃতি। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই ‘রাজা’ নেই, কিন্তু তাঁর রাজত্ব এখনও শেষ হয়নি। ২০১৭ সালের এই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি এই অভিনেতা। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় প্রিয় নায়করাজকে স্মরণ করেছেন তারকারা।

নায়করাজ ছিলেন অভিভাবকের মতো: শাকিব
মৃত্যুবার্ষিকীতে নায়করাজকে স্মরণ করে আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন চিত্রনায়ক শাকিব খান। রাজ্জাককে নিজের অভিভাবক ও মাথার ওপর ছায়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
শাকিব লিখেছেন, ‘নায়করাজ রাজ্জাক আঙ্কেলকে হারানোর ৯ বছর আজ। তাঁকে হারানোর শূন্যতা আজও সমানভাবে অনুভব করি।’ তাঁর ভাষায়, রাজ্জাক শুধু কিংবদন্তি নায়কই ছিলেন না, ছিলেন চলচ্চিত্রের অভিভাবক, অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসার আশ্রয়।
রাজ্জাকের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে শাকিব বলেন, তিনি স্নেহ দিয়েছেন, আগলে রেখেছেন এবং প্রয়োজনের সময় পরামর্শ দিয়েছেন। অনেক দিন দেখা না হলেও রাজ্জাক বুঝতে পারতেন তিনি কেমন আছেন।
শাকিব আরও বলেন, নায়করাজ নেই, তবে তাঁর স্নেহ, শিক্ষা ও আশীর্বাদ এখনো পথচলার অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যত দিন থাকবে, তত দিন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন নায়করাজ রাজ্জাক।

ডলি জহুরের চোখে যেমন ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক
নায়করাজ রাজ্জাকের সঙ্গে ‘বাবা কেন চাকর’সহ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন ডলি জহুর। সহশিল্পী হিসেবে রাজ্জাককে অত্যন্ত আন্তরিক ও সময়সচেতন মানুষ হিসেবে মনে করেন তিনি।
ডলি জানান, রাজ্জাক নিজের অভিজ্ঞতা সহশিল্পীদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন এবং কাজ বুঝিয়ে দিতেন। সেটে কাজের ক্ষেত্রে ছিলেন বেশ নিয়মকানুনের মানুষ। সন্ধ্যার মধ্যেই শুটিং শেষ করতেন, রাতে কাজ না করে সবাইকে বিশ্রামের সুযোগ দিতেন।
অভিনেতা থেকে পরিচালক হিসেবেও রাজ্জাকের কাজ কাছ থেকে দেখেছেন ডলি। তাঁর মতে, কাজের খুঁটিনাটি বিষয়ে রাজ্জাকের নজর ছিল এবং খুব যত্ন নিয়ে শিল্পীদের দিয়ে অভিনয় করাতেন।
তবে কাজের বাইরে ছিলেন বেশ প্রাণবন্ত। ডলি বলেন, খাওয়ার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসে আনন্দ করতেন। কঠোর নিয়মের আড়ালে সহকর্মীদের জন্য ছিল তাঁর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা।

নায়করাজকে নিয়ে স্মৃতিচারণে সোহেল রানা
নায়করাজ রাজ্জাকের প্রয়াণদিনে তাঁকে স্মরণ করে স্মৃতির ঝাঁপি খুলেছেন অভিনেতা ও পরিচালক সোহেল রানা। তাঁর মতে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে সোনালি যুগে পৌঁছে দিতে রাজ্জাক নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
সোহেল রানা বলেন, সিনেমার প্রতি রাজ্জাকের নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ও ডেডিকেশন ছিল অতুলনীয়। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও জুনিয়র শিল্পীদের সঙ্গে তিনি কখনো দূরত্ব তৈরি করতেন না। বরং অভিভাবকের মতো দিকনির্দেশনা দিতেন এবং হাতে ধরে অভিনয় শেখাতেন।
নিজের প্রথম সিনেমা ‘মাসুদ রানা’ পরিচালনার স্মৃতিও জানান সোহেল। ছবিতে মাত্র এক মিনিটেরও কম সময়ের একটি অতিথি চরিত্রে অভিনয়ের অনুরোধ করলে ব্যস্ততার মধ্যেও রাজ্জাক রাজি হন। এমনকি রাত ১০টার পর শুটিংয়ের সময়ও বের করে দেন। নায়করাজের এই উদারতা আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন সোহেল রানা।

নায়করাজকে ‘মহানায়ক’ বললেন নূতন
নায়করাজ রাজ্জাককে হারানোর নয় বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর স্মৃতি আজও অমলিন অভিনেত্রী নূতনের মনে। সহকর্মীর পাশাপাশি রাজ্জাকের ভক্তও ছিলেন তিনি।
নূতনের ভাষায়, ‘আমাদের দেশে মহানায়ক বলে কেউ থাকলে তিনি নায়করাজ রাজ্জাক।’ শুটিংয়ের ফাঁকে রাজ্জাকের সঙ্গে আড্ডায় তাঁর শুরুর দিকের সংগ্রামের গল্প শুনতেন নূতন।
রাজ্জাকের অভিনয় থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। ‘নীল আকাশের নিচে’ দেখে মুগ্ধ হয়ে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। পরে রাজ্জাকের সঙ্গে বহু সিনেমায় অভিনয় করেছেন নূতন। তাঁর প্রযোজনা ও পরিচালনায়ও কাজের সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

রাজ্জাককে ‘মাটির মানুষ’ বললেন ঝন্টু
নায়করাজ রাজ্জাকের স্মৃতি আজও পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর মনে অমলিন। তাঁর চোখে রাজ্জাক ছিলেন অত্যন্ত ভালো ও মাটির মানুষ।
ঝন্টু বলেন, রাজ্জাককে কখনো রাগ করতে দেখেননি তিনি। সবসময় নরম মেজাজে কথা বলতেন। তাঁর পরিচালিত ‘বাপ বেটির যুদ্ধ’ সিনেমায় কাজের সময় রাজ্জাক তাঁকে নিজের ছেলের মতো আদর করতেন।
রাজ্জাককে ঘিরে বিশেষ একটি স্মৃতি থাকলেও তা প্রকাশ করতে রাজি নন ঝন্টু। তাঁর ভাষায়, সেই ঘটনা বললে নিজের বাহাদুরি দেখানো হবে। তাই স্মৃতিটি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন তিনি।






