একসময় সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম খেতেন নায়করাজ রাজ্জাক। টেলিভিশনে অভিনয় করে সপ্তাহে পেতেন মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অথচ মাসে সংসার চালাতে প্রয়োজন হতো প্রায় ৬০০ টাকা। সন্তানদের দুধ কিনতেই আয়ের বড় অংশ চলে যেত। কখনো স্ত্রী খায়রুন্নেসাকে নিয়ে উপোসও করতে হয়েছে। সেই মানুষটিই পরে হয়ে ওঠেন ঢালিউডের মহানায়ক।

ল্যাম্পপোস্টের নিচে শুরু হয়েছিল নতুন জীবন
১৯৬৪ সালে শূন্য হাতে ঢাকায় আসেন রাজ্জাক। স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে নিয়ে তখন তাঁর সামনে ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পরিচিতজনও তেমন কেউ ছিলেন না। একসময় স্টেডিয়াম এলাকার একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে পরিবার নিয়ে বসতে হয়েছিল তাঁকে। পরে সেই দৃশ্যই হয়ে ওঠে রাজলক্ষ্মী প্রতিষ্ঠানের প্রতীকি লোগোর অংশ।
রাজ্জাকের বড় ছেলে বাপ্পারাজ জানিয়েছেন, ১৯৬৪ সালে ঢাকায় এসে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসার ঘটনাটিই লোগোতে তুলে ধরা হয়েছে। রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের যাত্রার সময় বাবার পরিকল্পনা অনুযায়ী লোগোটির নকশা করেছিলেন অভিনেতা ও নির্মাতা সুভাষ দত্ত। পরে পরিবারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাইনবোর্ডেও এই লোগো ব্যবহার করা হয়।
খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল রাজ্জাকের
১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম রাজ্জাকের। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলায় অভিনয়ের কথা ভাবেননি। বরং খেলোয়াড় হওয়ার ইচ্ছা ছিল। তবে স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় একটি মঞ্চনাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। সেই অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাঁকে অভিনয়ের দিকে টেনে নেয়।
এসএসসি পাস করার পর নিয়মিত অভিনয়ে যুক্ত হন রাজ্জাক। টেলিভিশন নাটকেও সুযোগ পান। কলকাতায় কাজের সময় উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। পরিচালক তপন সিনহা ও পীযূষ বোসের সান্নিধ্যও পান। পরে পীযূষ বোসের পরামর্শেই ঢাকায় আসার পথ তৈরি হয়। তবে নায়ক হওয়ার স্বপ্নটি তখনও তাঁর মনে শক্তভাবেই ছিল।
১৯৫৮ সালে ‘রতন লাল বাঙালি’ ছবিতে ‘পকেটমার’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন রাজ্জাক। পরে ‘শিলালিপি’ ছবিতে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে একটি গানের দৃশ্যে অংশ নেন। সেখান থেকে সম্মানী পান ২০ টাকা। টালিগঞ্জে ছোটখাটো চরিত্রে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, সেখানে হয়তো সারাজীবন ‘এক্সট্রা’ হয়েই থাকতে হবে।
নায়ক হওয়ার স্বপ্নে পাড়ি দেন মুম্বাইয়ে
১৯৫৯ সালে নায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাই যান রাজ্জাক। ভর্তি হন ফিল্মালয়ে। সেখানে দিলীপ কুমার ও শশধর মুখার্জির মতো ব্যক্তিত্বরা ক্লাস নিতেন। কিন্তু অস্থির স্বভাবের কারণে কোর্স শেষ করা হয়নি। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ব্যবসা ও চাকরিতেও স্থির হতে পারেননি। কারণ তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই নায়ক হওয়া।
১৯৬২ সালে কলকাতার বাঁশদ্রোণী এলাকায় খায়রুন্নেসার সঙ্গে রাজ্জাকের পরিচয়। পরে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়। তখন রাজ্জাকের বয়স মাত্র ২০ বছর। বছর না ঘুরতেই জন্ম নেয় তাঁদের প্রথম সন্তান বাপ্পা। ১৯৬৪ সালে ঢাকায় আসার সময় বাপ্পার বয়স ছিল মাত্র আট মাস।
সংসারের কঠিন সময়ে পাশে ছিলেন স্ত্রী
খায়রুন্নেসা পরে ‘লক্ষ্মী’ নামেই পরিচিত হন। স্বামীর অভিনয়ের স্বপ্নের পাশে থেকেছেন তিনি। ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্তেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার জমিজমা বিক্রি করে রাজ্জাক স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। নতুন শহরে শুরু হয় তাঁদের জীবনের আরেক অধ্যায়।
১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকায় পৌঁছান রাজ্জাক। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে প্রথমে কমলাপুরে ৮০ টাকা মাসিক ভাড়ার বাসায় ওঠেন। এরপর বদলেছে ঠিকানা কমলাপুর থেকে দিলু রোড, ফার্মগেট হয়ে পরে গুলশানের লক্ষ্মীকুঞ্জ। প্রায় নয় বছর ধরে চলেছে এই ঠিকানা বদলের সময়।

সপ্তাহে ৬০-৬৫ টাকায় চলত সংসার
ঢাকায় টেলিভিশনে অভিনয় করেই জীবিকা চালাতেন রাজ্জাক। ফার্মগেটে স্ত্রী লক্ষ্মী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন। অভিনয় করে সপ্তাহে পেতেন ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অথচ সংসারের মাসিক খরচ ছিল প্রায় ৬০০ টাকা। ফলে সামান্য আয়ে পরিবার চালানো ছিল কঠিন।
২০১৬ সালে নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে রাজ্জাক জানিয়েছিলেন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনেক সময় অর্ধাহারে দিন কেটেছে তাঁর। টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানের জন্য সপ্তাহে পাওয়া ৬৫ টাকা দিয়েই চলত সংসার। সন্তানদের দুধ কিনতে গিয়ে প্রায় পুরো আয় শেষ হয়ে যেত। কখনো স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই উপোস করতে হয়েছে। অর্থের অভাবে ফার্মগেট থেকে ডিআইটি টেলিভিশন কেন্দ্রে হেঁটেও যাতায়াত করতেন তিনি।
১৯৬৫ সালে ‘আখেরি স্টেশন’ ছবিতে সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক। এরপর একের পর এক ছোট চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। অটোরিকশাচালক, পাড়ার ছেলে, আদালতের কর্মচারী কিংবা বাইজিবাড়ির মাতাল বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু ছোট চরিত্র তাঁর নায়ক হওয়ার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। অভিনয়জীবনের একপর্যায়ে পরিচয় হয় নির্মাতা জহির রায়হানের সঙ্গে। তাঁর ‘বেহুলা’ ছবিতে রাজ্জাককে নায়ক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নায়ক হিসেবে প্রথম বড় সুযোগটি আসে তখনই। সাইনিং মানি হিসেবে পান ৫০০ টাকা। সেই টাকা নিয়ে আনন্দে বাড়ি ফেরেন তিনি।

‘বেহুলা’ বদলে দিল সব হিসাব
মুক্তির পর ‘বেহুলা’ দর্শকের কাছে দারুণ সাড়া পায়। পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্রপ্রেমীরা নতুন নায়ক রাজ্জাককে গ্রহণ করে নেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ছোট চরিত্র থেকে নায়ক রাজ্জাকের দীর্ঘ সংগ্রামের সবচেয়ে বড় বাঁক ছিল ‘বেহুলা’।
‘বেহুলা’র পর একের পর এক সফল ছবিতে অভিনয় করেন রাজ্জাক। ধীরে ধীরে তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় তারকা হয়ে ওঠেন। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘নায়করাজ’ উপাধি। তবে নিজের সাফল্যকে কখনো একার অর্জন মনে করেননি তিনি। পরিচালক ও সহশিল্পীদের অবদানের কথাও বারবার স্মরণ করেছেন।

মহাতারকা হয়েও ভুলে যাননি সংগ্রামের দিন
২০১৬ সালে নিজের জীবন নিয়ে কথা বলার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন রাজ্জাক। বলেছিলেন, নায়করাজ হয়ে ওঠা তাঁর একার পক্ষে সম্ভব হয়নি। জীবনের শুরুর দিকে তিনি এমনও সময় পার করেছেন, যখন শুধু রোববার বাড়ি যেতে পারতেন। অন্য দিনগুলো মেকআপ রুমের মেঝেতেই ঘুমিয়ে কাটত। রাজ্জাকের তারকাখ্যাতির পেছনে স্ত্রী খায়রুন্নেসার অবদানও ছিল গভীর। সংসার সামলে তিনি স্বামীর পাশে থেকেছেন। গুলশান-২ নম্বরে রাজ্জাক নিজের বাড়ির নাম রাখেন ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’। একসময় এই বাড়ি ছিল শিল্পীদের আড্ডার অন্যতম জায়গা। সহকর্মী ও অনুজদের আপন করে নিতেন রাজ্জাক।
রাজ্জাকের মৃত্যুর পরও লক্ষ্মীকুঞ্জে তাঁর শোবার ঘরটি আগের মতোই রাখা হয়েছে। ঘরে রয়েছে তাঁর পোশাক, পারফিউমসহ ব্যবহার করা নানা জিনিস। এমনকি বাথরুমের সাবানটিও পড়ে আছে আগের জায়গায়। এসব জিনিস যেন পরিবারের কাছে তাঁর উপস্থিতিরই স্মারক। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট রাজ্জাকের মৃত্যুর পর স্তব্ধ হয়ে যায় চলচ্চিত্র অঙ্গন। লক্ষ্মীকুঞ্জের ব্যালকনিতে যে চেয়ারে বসতেন তিনি, সেটি এখন খালি। নাতি-নাতনি ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সেই জায়গাটি এখন শুধু স্মৃতি বহন করে।
রাজ্জাক নিয়মিত সন্তানদের ফোন করে খোঁজ নিতেন। দুপুরে জানতে চাইতেন, কখন বাড়ি ফিরবে। রাতে শুটিং শেষ হয়েছে কি না, খাওয়া হয়েছে কি না এসব নিয়েও খোঁজ নিতেন। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার অভ্যাস ছিল তাঁর। তাই এখন সেই ফোন আর না আসার শূন্যতাই সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন সন্তানরা।

ল্যাম্পপোস্ট থেকে মহানায়ক এক জীবন, এক ইতিহাস
শূন্য হাতে ঢাকায় এসে যে মানুষটিকে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসতে হয়েছিল, তিনিই পরে হয়ে ওঠেন ঢালিউডের নায়করাজ। সপ্তাহে ৬০-৬৫ টাকার আয়, সংসারে অর্ধাহার, হেঁটে টেলিভিশন কেন্দ্রে যাওয়া সব পেরিয়ে তিনি পেয়েছেন কোটি দর্শকের ভালোবাসা। ২০১৭ সালে চলে গেলেও রাজ্জাক আজও বেঁচে আছেন তাঁর সিনেমা, চরিত্র ও অসংখ্য স্মৃতিতে। উত্তরার রাজলক্ষ্মীর লোগোতে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসা সেই মানুষটি যেন আজও মনে করিয়ে দেন শূন্য থেকেও শুরু করা যায়, যদি স্বপ্নটা বড় হয়।






