Sunday, October 18, 2026

সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

অমিতাভ বচ্চন – যে গল্প কখনো বলা হয়নি

October 16, 2026

আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা নায়িকা কে ?

October 12, 2026

সালমান শাহ কেন এত অল্প সময়ে কিংবদন্তি হয়ে গেলেন?

October 2, 2026

কেন অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যাওয়া ছেড়ে দিলেন আমির খান?

September 26, 2026

সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোর অবিশ্বাস্য গল্প 

September 17, 2026

বাংলা নাটকের শিকড়সন্ধানী নাট্যকার সেলিম আল দীন। নাটক রচনায় ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকের রচনারীতি ও পরিবেশনা শৈলীর নতুন রূপ নির্মাণ করেছিলেন তিনি। আজ এই নাট্যব্যক্তিত্বের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের এই দিনে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিলে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

বাংলা নাটকের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু নাম হয়ে থাকে না। তারা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতীক, একটি শিল্পবোধের নির্মাতা এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ভাষ্যকার। সেলিম আল দীন তেমনই এক বিরল স্রষ্টা। তাঁর জন্মদিনে বাংলা নাটকের সেই শিল্পীর কথাই ফিরে আসে, যিনি নাটকের ভাষাকে শহরের মঞ্চ থেকে বাংলার মাটি, মানুষ, লোকজীবন ও ইতিহাসের গভীরে নিয়ে গিয়েছিলেন।

১৮ আগস্ট বাংলা নাটকের এই গৌড়জনের জন্মদিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে সীমান্তবর্তী ফেনী জেলার সোনাগাজীর সেনেরখিলে জন্ম নেন রবীন্দ্রোত্তর বাংলা নাটকের অন্যতম প্রধান পুরুষ সেলিম আল দীন। তাঁর জন্ম শুধু একজন নাট্যকারের জন্ম ছিল না; ছিল বাংলা নাটকের নিজস্ব আত্মস্বর খুঁজে পাওয়ার এক দীর্ঘ অভিযাত্রার সূচনা।

সেলিম আল দীনের পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং মাতা ফিরোজা খাতুন। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। শৈশবের গ্রামীণ পরিবেশ, মাটির গন্ধ, মানুষের মুখ এবং লোকজীবনের বহুবর্ণ অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর সৃষ্টিশীলতার গভীরে জায়গা করে নেয়।

সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ
ছবি: সংগৃহীত

সেলিম আল দীনের নাট্যচর্চার শুরু

সেলিম আল দীনের লেখকজীবনের শুরু আরও আগে। ১৯৬৮ সালে কবি আহসান হাবীব সম্পাদিত ‘দৈনিক পাকিস্তান’ এর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘নিগ্রো সাহিত্য’ প্রবন্ধ। ১৯৬৯ সালে প্রচারিত হয় তাঁর প্রথম বেতার নাটক ‘বিপরীত তমসায়’। ১৯৭০ সালে আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় প্রচারিত হয় তাঁর প্রথম টেলিভিশন নাটক ‘লিব্রিয়াম’। ১৯৭২ সালে ‘বহুবচন’এর প্রযোজনায় মঞ্চে আসে তাঁর প্রথম নাটক ‘সর্প বিষয়ক গল্প’।

এরপর শুরু হয় তাঁর বিস্ময়কর নাট্যযাত্রা। এক নাটক থেকে আরেক নাটকে তিনি নিজের তৈরি সীমানা ভেঙেছেন। কখনো ভাষায়, কখনো আঙ্গিকে, কখনো বিষয় নির্বাচনে নতুন পথ তৈরি করেছেন।  ফলে তাঁর নাট্যভুবন কোনো স্থির পরিসর নয়; বরং তা বহমান নদীর মতো, যার প্রতিটি বাঁকে নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন শিল্পভাবনার দেখা মেলে।

শুরুতে বিদেশি নাট্যধারার প্রভাব থাকলেও দ্রুত তিনি ফিরে যান বাংলার মধ্যযুগীয় নাট্যরীতি, লোকঐতিহ্য, পালাগান, কাহিনি, আখ্যান এবং মানুষের জীবনসংলগ্ন শিল্পভাষার কাছে। তাঁর উপলব্ধি ছিল, আধুনিক হওয়া মানে নিজের শিকড়কে অস্বীকার করা নয়। বরং নিজের মাটির গভীরে প্রবেশ করেই বিশ্বমানবতার কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ
ছবি: সংগৃহীত

মাটি ও মানুষের নাট্যকার সেলিম আল দীন

সেলিম আল দীনের নাটকের মানুষগুলো মূলত প্রান্তিক। শ্রমজীবী, নিঃস্ব, লাঞ্ছিত, অবদমিত ও নানা সংকটে থাকা মানুষ তাঁর নাটকের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তবে তাঁদের তিনি শুধু করুণার পাত্র হিসেবে দেখেননি। তাঁদের জীবন, ভাষা, স্বপ্ন, ক্ষুধা, বিশ্বাস, বেদনা, প্রতিরোধ এবং অস্তিত্বের জটিলতাকে শিল্পের মর্যাদা দিয়েছেন।

‘জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘মুনতাসির’, ‘শকুন্তলা’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘হাতহদাই’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘চাকা’, ‘হরগজ’, ‘বনপাংশুল’, ‘প্রাচ্য’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’ ও ‘স্বর্ণবোয়াল’ তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক। প্রতিটি রচনাই তাঁর সৃষ্টিশীল অভিযাত্রার আলাদা মাইলফলক।

‘কিত্তনখোলা’য় লোকজীবনের গভীর স্রোত, ‘কেরামত মঙ্গল’ এ লোকঐতিহ্য ও মানুষের অস্তিত্বের বহুমাত্রিকতা, ‘চাকা’য় মৃত্যুযাত্রার মধ্য দিয়ে মানবজীবনের নির্মম বাস্তবতা এবং ‘যৈবতী কন্যার মন’ এ নারীজীবনের জটিলতা ফুটে উঠেছে। ‘হরগজ’ এর মতো রচনায় দুর্যোগ, মৃত্যু ও মানুষের অসহায়তার মধ্য দিয়ে সমাজের একটি গভীর চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি।

সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ
ছবি: সংগৃহীত

নাট্যশিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি নেওয়ার পর অধ্যাপনাকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন সেলিম আল দীন। ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি।

শিক্ষকতার পাশাপাশি চলেছে তাঁর নাট্যচর্চা। বাংলাদেশের নাট্যশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত গড়তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৮৬ সালে তাঁর উদ্যোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি বিভাগটিকে নাট্যশিক্ষা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশের নাটককে শুধু রাজধানী বা শহরের মঞ্চে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামবাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্নও ছিল তাঁর। সেই ভাবনা থেকেই ১৯৮১-৮২ সালে দেশব্যাপী গড়ে ওঠে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। এর আগে নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফের সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা থিয়েটার। বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যচর্চার ইতিহাসে এই উদ্যোগগুলোর গুরুত্ব আজও অনস্বীকার্য।

নিজস্ব শিল্পতত্ত্বে সেলিম আল দীন

সেলিম আল দীন পাশ্চাত্য শিল্পের প্রচলিত বিভাজনকে প্রশ্ন করে বাঙালির সহস্র বছরের নন্দনতত্ত্বের আলোকে নতুন শিল্পদৃষ্টির কথা বলেছেন। তাঁর এই ভাবনার সঙ্গে যুক্ত ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’। তাঁর কাছে নাটক শুধু নাটক হয়ে থাকবে না; এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে কবিতা, উপন্যাস, সংগীত, চিত্রকলা, লোককাহিনি ও আখ্যানের নানা উপাদান।

তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিসরও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদি ধারার সঙ্গে বাংলার আবহমান সংস্কৃতি, শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও লোকঐতিহ্যকে যুক্ত করে তিনি নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র এক নাট্যভুবন।

সেলিম আল দীন আজ নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আছে। মঞ্চের আলো নিভে যায়, অভিনেতারা ফিরে যান, দর্শকরাও হল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু সত্যিকারের শিল্পের আলো নিভে না। বাংলার মাটি, মানুষ ও লোকঐতিহ্যকে নাটকের কেন্দ্রে এনে যে শিল্পভাষা তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা বাংলা নাটকের ইতিহাসে তাঁকে স্থায়ী আসন দিয়েছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির নিজস্ব সুর যতদিন বেঁচে থাকবে, সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনাও ততদিন নতুন করে পাঠ ও আলোচনার জন্ম দেবে।

Share

Read more

Local News