তানজিন তিশার জামিন হয়েছে শাড়ি নিয়ে করা প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলায়। বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন অভিনেত্রী। শুনানি শেষে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। বিষয়টি জানিয়েছেন তানজিন তিশার আইনজীবী নিহার হোসেন ফারুক।
এর আগে গত ১২ জুলাই তানজিন তিশাকে আদালতে হাজির হতে সমন জারি করা হয়েছিল। সেই নির্দেশ অনুযায়ী বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির হন তিনি। এরপর তার পক্ষে জামিনের আবেদন করা হয়।
শুনানিতে তানজিন তিশার আইনজীবী নিহার হোসেন ফারুক বলেন, তার মক্কেল একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সে কারণেই তিনি আদালতে উপস্থিত হয়েছেন।
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাদীপক্ষের অনলাইন ফ্যাশন পেইজ ‘অ্যাপোনিয়া’তে একটি শাড়ি দেখে সেটি নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন তানজিন তিশা। তখন পেইজের পক্ষ থেকে তাকে শাড়িটি দেওয়ার পাশাপাশি পেইজটি উল্লেখ করে প্রচারণামূলক পোস্ট দেওয়ার কথা বলা হয়।
তিশা এতে সম্মতি দেন এবং শাড়িটি পাঠাতে বলেন। আইনজীবীর দাবি, পরে শাড়িটি পাওয়ার পর তানজিন তিশা সেটি নিয়ে ভিডিও প্রকাশও করেছেন। ছবি প্রকাশের কথাও ছিল। তবে এর মধ্যেই বাদীপক্ষ আদালতে মামলা করেন বলে শুনানিতে দাবি করা হয়।

আদালতে শাড়ি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য
শুনানির একপর্যায়ে তানজিন তিশার আইনজীবী আদালতে সেই শাড়িটি উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, শাড়িটি আসামিপক্ষের কাছে রয়েছে এবং এর ভাঁজও খোলা হয়নি।
এ বক্তব্যের সঙ্গে বাদীপক্ষের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মুকুল ভিন্নমত জানান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শাড়ির ভাঁজ যদি না খোলা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি পরে কীভাবে ভিডিও করা হলো।
এ নিয়ে আদালতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে কথা তর্ক-বিতর্ক হয়। তানজিন তিশাও তখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বারবার মাথা নাড়ছিলেন এবং কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন। তবে তার আইনজীবীরা তাকে কথা না বলার জন্য বলেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিচারকও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, এখন শাড়িটি নিয়ে কী করা হবে, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী শুনানিতে বলেন, মামলাটি হঠাৎ করে করা হয়নি। এর আগে তানজিন তিশাকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মামলাটি বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তের আওতায় রয়েছে। ডিবি পুলিশ একাধিকবার ডাকলেও তানজিন তিশা হাজির হননি বলে আদালতে দাবি করা হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, মামলায় যে ধারাগুলোতে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো জামিন অযোগ্য। তার ভাষ্য, আইন সবার জন্য সমান এবং একজন অভিনেত্রীর ক্ষেত্রেও একই আইন প্রযোজ্য। এ কারণে তানজিন তিশাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তিনি।
তিশার বিরুদ্ধে মামলায় আনা অভিযোগ
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, অনলাইন ফ্যাশন পেইজ ‘অ্যাপোনিয়া’ থেকে ২৮ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের একটি শাড়ি নিয়েছিলেন অভিনেত্রী তানজিন তিশা। অভিযোগে বলা হয়েছে, শাড়িটি পরে পেইজটির প্রচারে অংশ নেওয়া এবং এর মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।
বাদীপক্ষের দাবি, পরে তানজিন তিশার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে মামলা করা হয়।
অ্যাপোনিয়ার প্রশাসক আমিনুল ইসলাম ২০২৫ সালের নভেম্বরে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে আদালতে মামলাটি করেন। বাদীর জবানবন্দি শোনার পর আদালত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
পরে ডিবি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। গত ১২ জুলাই আদালত সেই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। একই সঙ্গে ১৩ আগস্ট আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশের পরই বৃহস্পতিবার আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিনের আবেদন করেন অভিনেত্রী।
তবে অভিযোগের বিষয়ে তানজিন তিশার অবস্থান ভিন্ন। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেছিলেন, শাড়িটি তাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। ফলে শাড়িটি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে শুরু থেকেই পার্থক্য রয়েছে।

শাড়ির জন্য আদালতে আসা কাম্য নয়: তিশা
শুনানি শেষে তানজিন তিশা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতকে সম্মান করি বলেই, আমি এখানে এসেছি। আশা করব আমি সামনেও ন্যায়বিচার পাবো। ন্যায়বিচার পাবো। আমার অনেক সম্মানহানি হয়েছে। আমি একটা কথা বলতে চাই। আজকে যিনি আমার নামে এই কাজটা করেছে, আমাকে হ্যারাজ করার জন্য, তিনিও একজন নারী। তিনি এবং তার স্বামীর ক্ষমতা দেখিয়ে আমার সাথে এটা করেছে। আমাকে অনেক ধরনের হুমকিও দিয়েছে। সেগুলো আমি সামনে হয়তো আপনাদের জানাবো।’
অভিনেত্রী আরও বলেন, ‘আরেকটা কথা বলতে চাই, আজকে সাতাশ হাজার টাকার একটা শাড়ির জন্য আমাকে আদালতে আসতে হলো। আমি নাকি আত্মসাৎ করেছি। আমার পনেরো বছরের ক্যারিয়ার। এটা আসলে কারোরই কাম্য না যে, আমি একটা শাড়ির জন্য আদালতে আসবো, তাই না?’
তিনি আরও বলেন, ‘আর কেউ যাতে এভাবে কাউকে হ্যারেজ না করে। আমি যাতে আইনে ন্যায়বিচার পাই। এটাই আমার চাওয়া।’



