বিশ্বমঞ্চে মণিপুরি সংস্কৃতি
বাংলাদেশের মণিপুরি নৃত্যশিল্পী ও গবেষক সুইটি দাস তাইওয়ানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নৃত্য সম্মেলন ইন্টারন্যাশনাল ড্যান্স কনফারেন্স ফেস্টিভ্যাল (আইডিসিএফ) ২০২৬-এ বাংলাদেশের মণিপুরি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর গবেষণা উপস্থাপন করেছেন।
২৩ থেকে ২৭ জুন তাইওয়ানের তাইচুং শহরে অবস্থিত ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটি অব স্পোর্টস-এ এই সম্মেলনের আয়োজন করে ওয়ার্ল্ড ড্যান্স অ্যালায়েন্স (ডব্লিউডিএ) এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৃত্যগবেষক, শিল্পী, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা এতে অংশ নেন।
সেই আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক এবং দীক্ষা ড্যান্স ইনস্টিটিউট-এর পরিচালক ও অধ্যক্ষ সুইটি দাস।
সম্মেলনে তিনি ‘বাংলাদেশের মণিপুরি সম্প্রদায়: দেহভিত্তিক ভক্তি ও সাংস্কৃতিক অভিযোজন’ বিষয়ক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। গবেষণায় তুলে ধরা হয়, কীভাবে বাংলাদেশের মণিপুরি জনগোষ্ঠী ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, নৃত্য, সংগীত, নাট্যচর্চা এবং দৈনন্দিন ভক্তিমূলক জীবনধারার মাধ্যমে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ করে আসছে। একই সঙ্গে আধুনিক সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েও তারা কীভাবে তাদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে, সে বিষয়টিও গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে।

এই গবেষণা একদিনের নয়। সুইটি দাস টানা আট বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মণিপুরি সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি বিকাশে নিবেদিত প্রতিষ্ঠান ‘সাধনা- এ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব সাউথ এশিয়ান কালচার’-এর অধীনে তিনি দীর্ঘ সময় মাঠপর্যায়ের গবেষণা পরিচালনা করেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে তিনি মণিপুরি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন ধর্মীয় আচার, সামাজিক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। নৃ-গবেষণাভিত্তিক (এথনোগ্রাফিক) পদ্ধতিতে তিনি তাদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা দিক পর্যবেক্ষণ, নথিভুক্ত এবং বিশ্লেষণ করেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মণিপুরি সম্প্রদায়ের জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল তৈরি হয়েছে।
গবেষণাপত্র উপস্থাপনের পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে সুইটি দাস বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের। এই অর্জন শুধু আমার নয়; এটি বাংলাদেশের মণিপুরি সম্প্রদায়ের, যাদের আস্থা, জ্ঞান ও সহযোগিতা বছরের পর বছর আমার গবেষণার পথকে সমৃদ্ধ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, তাঁর এই সাফল্য বাংলাদেশের মণিপুরি সম্প্রদায়ের প্রতি উৎসর্গ করা হলো। দীর্ঘ গবেষণা যাত্রায় যেসব গুরু, শিল্পী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়ের সদস্যরা তাঁকে উৎসাহ, দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা দিয়েছেন, তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি।
সাংস্কৃতিক গবেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই ধরনের গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে শুধু মণিপুরি সম্প্রদায়ের শিল্প-সংস্কৃতিই নয়, বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ও বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, মণিপুরি নৃত্য দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শাস্ত্রীয় নৃত্যধারা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বসবাসকারী মণিপুরি জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই নৃত্য, সংগীত ও ধর্মীয় ঐতিহ্য লালন করে আসছে। সুইটি দাসের গবেষণা সেই উত্তরাধিকারকে আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
আয়োজকদের মতে, আইডিসিএফ ২০২৬ সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৃত্যঐতিহ্য, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। সেই লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং মণিপুরি সংস্কৃতি নিয়ে সুইটি দাসের গবেষণা আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকারীদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।