সিনেমার জন্য সম্পত্তি বিক্রি
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুনীল দত্ত শুধু একজন সফল অভিনেতা নন, তিনি ছিলেন একজন সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টা। অভিনয়, প্রযোজনা, পরিচালনা, সমাজসেবা ও রাজনীতিতে সমানভাবে পরিচিত এই কিংবদন্তি শিল্পী একসময় নিজের স্বপ্নের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন। এমনকি একটি সিনেমার জন্য তাঁকে নিজের বাড়ি বন্ধক রাখতে, গাড়ি বিক্রি করতে এবং সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল।
১৯৭১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রেশমা অউর শেরা’ ছিল সুনীল দত্তের স্বপ্নের প্রকল্প। রাজস্থানের পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে প্রেম, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং প্রতিশোধের গল্পকে ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন তিনি। বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে শিল্পমানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলেই ছবিটি তাঁর কাছে ছিল বিশেষ।
চলচ্চিত্রে ক্যারিয়ার শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যেই অভিনেত্রী নার্গিসকে বিয়ে করেন সুনীল দত্ত। পরে তাঁদের সংসারে জন্ম হয় সঞ্জয় দত্তের। বিয়ের পর নার্গিস অভিনয় থেকে অনেকটাই সরে আসেন, ফলে পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের বড় অংশ এসে পড়ে সুনীলের ওপর। কিন্তু তিনি সবসময় শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতেন, যা অনেক সময় আর্থিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াত।

‘রেশমা অউর শেরা’র শুটিং শুরু হওয়ার সময় পরিকল্পনা ছিল মাত্র ১৫ দিনে কাজ শেষ করার। কিন্তু রাজস্থানের প্রত্যন্ত পোচিনা গ্রামে শতাধিক সদস্যের ইউনিট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সময় ও ব্যয় দুটোই কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ১৫ দিনের শুটিং শেষ হতে সময় লাগে দুই মাসেরও বেশি।
সুনীল দত্ত ছিলেন অত্যন্ত পরিপূর্ণতাবাদী। একটি দৃশ্যের জন্য ১০০টি উট প্রয়োজন হলে ৯৯টি উট পেয়ে তিনি শুটিং শুরু করেননি। তাঁর মেয়ে নর্মতা দত্ত পরে স্মৃতিচারণায় এ ঘটনা উল্লেখ করেন। অভিনেত্রী রাখী গুলজারও জানিয়েছিলেন, শুটিংয়ের শুরুতে কয়েক দিন তাঁকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেই দেওয়া হয়নি। স্থানীয় মানুষদের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করে চরিত্রে ঢোকার নির্দেশ দিয়েছিলেন পরিচালক।
এই ধরনের সিদ্ধান্ত চলচ্চিত্রের গুণগত মান বাড়ালেও বাজেটকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় অবস্থিত নিজের বাংলো বন্ধক রাখতে বাধ্য হন সুনীল দত্ত। অন্য ছবিতে অভিনয় করে যে পারিশ্রমিক পেতেন, তার প্রায় সবটাই ব্যয় করতেন এই সিনেমার পেছনে।

এই ছবিতেই ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পরবর্তীকালের মহাতারকা অমিতাভ বচ্চন। তখনও তিনি বলিউডে প্রতিষ্ঠিত নন। মজার বিষয় হলো, তাঁর চরিত্রটি ছিল বোবা। পরবর্তীকালে যে কণ্ঠস্বর অমিতাভকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়, সেই কণ্ঠ নিয়েই তখন অনেকের সন্দেহ ছিল।
১৯৭১ সালে মুক্তির পর ‘রেশমা অউর শেরা’ সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও বক্স অফিসে সফল হয়নি। ছবিটি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতে এবং ভারতের পক্ষ থেকে অস্কারের জন্য মনোনয়নও পায়। কিন্তু এসব সম্মান আর্থিক ক্ষতি পূরণ করতে পারেনি।
সংকটের সময় সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন স্ত্রী নার্গিস। পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার মধ্যেও তিনি কখনো অভিযোগ করেননি। এমন দিনও এসেছে, যখন নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য ছিল না। তখন পুরোনো কাপড় মেরামত করেই ব্যবহার করতেন তিনি। একসময় সংসার চালানোর মতো টাকাও না থাকায় নার্গিস জমিয়ে রাখা খুচরা পয়সার বাক্স ভেঙে খরচের ব্যবস্থা করেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম এবং নতুন নতুন কাজে নিজেকে যুক্ত করে ঘুরে দাঁড়ান সুনীল দত্ত। ‘রেশমা অউর শেরা’ তাঁকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল, কিন্তু একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর স্বপ্ন ও সাহসকে কখনো ভেঙে দিতে পারেনি। আজও এই সিনেমার গল্প শুধু একটি চলচ্চিত্রের ইতিহাস নয়, বরং একজন নির্মাতার স্বপ্নের জন্য সর্বস্ব বাজি রাখার অনন্য উদাহরণ।