কিংবদন্তি অভিনেতা
বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হুমায়ূন ফরীদি এক উজ্জ্বল নাম। শক্তিশালী সংলাপ, অনন্য অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে আলাদা করে তুলেছিল। খলচরিত্র হোক কিংবা সমাজবাস্তবতার কোনো চরিত্র, সবখানেই তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র।
আজ তার জন্মদিন। এদিনে সহকর্মী, ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছেন বাংলা অভিনয়ের এই কিংবদন্তিকে।

ছাত্রজীবন থেকেই অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন হুমায়ূন ফরীদি। মঞ্চনাটকের মাধ্যমে শুরু হলেও খুব দ্রুত তিনি টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি ‘ভূত’ নামে একটি মঞ্চনাটক পরিচালনা করেছিলেন। অভিনয়ের পাশাপাশি নির্দেশনাতেও তার আগ্রহ ছিল সমান।
মঞ্চনাটকে উজ্জ্বল উপস্থিতি
বাংলা নাট্যাঙ্গনে হুমায়ূন ফরীদির অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটকের মধ্যে রয়েছে ‘শকুন্তলা’, ‘ফণীমনসা’, ‘কীর্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’ এবং ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’।
ঢাকা থিয়েটারের হয়ে ‘সংবাদ কার্টুন’ নাটকের মাধ্যমে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে মঞ্চের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
টেলিভিশন নাটকে দর্শকপ্রিয়তা
হুমায়ূন ফরীদির অভিনয়জীবনের অন্যতম শক্তিশালী অধ্যায় টেলিভিশন নাটক। তার সংলাপ বলার ভঙ্গি, কণ্ঠস্বর এবং শরীরী ভাষা দর্শকদের মুগ্ধ করত।
‘সংশপ্তক’ নাটকের কানকাটা রমজান চরিত্রটি আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে। নেতিবাচক চরিত্র হয়েও তিনি চরিত্রটিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে তা দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছিল।

‘বকুলপুর কত দূর’ নাটকে তার অভিনয় ছিল গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক।
‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকেও তার উপস্থিতি ছিল স্মরণীয়। ছোট চরিত্রেও কীভাবে দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলা যায়, তার অনন্য উদাহরণ ছিলেন তিনি।
চলচ্চিত্রে নতুন ধারা
নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও সমান সাফল্য পেয়েছেন হুমায়ূন ফরীদি। ‘মাতৃত্ব’, ‘ব্যাচেলর’, ‘শ্যামল ছায়া’ ও ‘দহন’ এর মতো চলচ্চিত্রে তার অভিনয় এখনও প্রশংসিত।

বিশেষ করে খলচরিত্রে অভিনয় করে তিনি ঢাকাই সিনেমায় নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন। তার উপস্থিতি ভিলেন চরিত্রকে শুধু নেতিবাচক রাখেনি, বরং তা করেছে আরও বাস্তব ও শক্তিশালী।

অভিনয়ের বাইরে সমাজ সচেতন মানুষ
শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, সমাজ সচেতন ব্যক্তি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন হুমায়ূন ফরীদি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান এবং সংস্কৃতিচর্চায় সক্রিয় ভূমিকার কারণে সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি ছিলেন প্রিয়।
জন্মদিনে তারকাদের শ্রদ্ধা
হুমায়ূন ফরীদির জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মৃতিচারণ করেছেন দেশের জনপ্রিয় তারকারা।
অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী লিখেছেন,
আজ ফরীদি ভাইয়ের জন্মদিন। ক্ষণজন্মা এই অভিনেতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা তার একটি বিখ্যাত মন্তব্য তুলে ধরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সেখানে হুমায়ূন ফরীদি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উদ্দেশে বলেছিলেন,
টাকার পেছনে না ছুটে ভালো অভিনয় করো। টাকা এমনিই আসবে।
শাকিব খানও নিজের ফেসবুক পেজে শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন,
দেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান অভিনেতাদের একজন ছিলেন হুমায়ূন ফরীদি ভাই। তার অভিনয় বাঙালির মনে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
অভিনেতা অপূর্ব লিখেছেন,
ফরীদি ভাই, এখনো আপনাকে মিস করি।
অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলনও একটি পুরোনো ছবি শেয়ার করে তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন।
নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা আফরান নিশো বহুবার বলেছেন, হুমায়ূন ফরীদি তার অভিনয়জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও পুরস্কার গ্রহণের সময়ও তিনি ফরীদির কথা স্মরণ করেন।
২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন হুমায়ূন ফরীদি। তবে তার প্রস্থান বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্র থেকে তাকে মুছে দিতে পারেনি।
তার অভিনীত চরিত্র, সংলাপ এবং অসাধারণ উপস্থিতি আজও দর্শকের মনে সমানভাবে জীবন্ত। জন্মদিনে তাই আবারও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে বাংলা অভিনয়ের এই অনন্য কিংবদন্তিকে।


