সুমন-কৃষি-হাওয়া-রইদ
নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে যদি কেউ ঘুরতে যান প্রথমেই আপনাকে অবাক করে দিবে তাঁর বায়োতে লেখা কথাটি। সেখানে তিনি লিখেছেন-“জানিনা সুমন তুমি কৃষিকাজ কেন যে জানোনা।“ মানে একজন নির্মাতা আফসোস করছেন কৃষিকাজ না জানা নিয়ে। এর গূঢ় অর্থ অনেক। তবে এই আফসোসকে তিনি পরিণত করেছেন অনুপ্রেরণায়। জমিতে ফসল না ফলাতে পারলেও ভালো ফসল তিনি ফলিয়েছেন সিনেমায়। কৃষির দেশের একজন সন্তানের কৃষিকাজ না জানার ক্ষতিপূরণ হিসেবে শিল্পকর্ম দিয়ে তা পুষিয়ে দেয়াই বাঁ কম কিসে। পেটের ক্ষুধা আর মননের ক্ষুধা কেউ তো কারো থেকে কম গুরুত্বপুর্ণ নয়। পেটের ক্ষুধা মিটলে মানুষ বাঁচে আর মননের ক্ষুধা মিটলে বাঁচে শিল্প-সৃজনশীলতা এমনকি মনুষ্যত্ব যা মানুষ হয়ে উঠার অন্যতম উপাদান। তাই কৃষি না জানলেও মানুষের মননের ক্ষুধা নিবারণের যোগান তিনি ঠিকই দিয়ে যাচ্ছেন। তাই একে সিনেমা-কৃষিও বলা যেতে পারে।
নির্মাতা সুমনের এই সিনেমা-কৃষির প্রথম ফসলের নাম ‘হাওয়া’। এখানে একটি বিষয় খুব উল্লেখ্যযোগ্য যে কৃষিতে হাওয়ার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটা অনুকূল-প্রতিকূল উভয়ই আছে। পরাগায়ণ থেকে শুরু করে ঝড়; উত্থান-পতন। হাওয়া সিনেমাটির নামকরণ তাই উভয় প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীক বহনকারী। তাঁর নিজের ভাবনার সাথে তাঁর শিল্পকর্ম সিনেমার।

মেজবাউর রহমান সুমনের সিনেমা-কৃষির দ্বিতীয় ফসলের নাম ‘রইদ’। কৃষিতে হাওয়ার মতো রইদের গুরুত্বও অনেক। কারণ রইদও কৃষির অন্যতম প্রধান উপাদান। ‘হাওয়া’-খ্যাত এই নির্মাতার নতুন সিনেমা ‘রইদ’ আগামী ঈদুল আজহায় মুক্তি পাবে। খবরটি নিশ্চিত করেছেন নির্মাতা নিজেই। এ নিয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘আসছে কোরবানি ঈদকে ঘিরেই পরিকল্পনা রয়েছে। ওই সময় চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে চাই। সেভাবেই কাজ করছি।’
কৃষিভিত্তিক সভ্যতার শুরু ও ক্রমবর্ধমান বিকাশের পরিক্রমায় মানুষের শিল্পচর্চায় অন্যতম বিষয় ছিলো পুরাণ-আখ্যান। যাকে মাইথোলজি নামেও ডাকা হয়। ফলে এই সময়ে বেড়ে উঠে নানান কাল্পনিক গল্প, পুরাণ ও লোকজ গল্প। তেমনই এক পুরাণ-আখ্যান নিয়ে নির্মাতা সুমন বানিয়েছেন তাঁর দ্বিতীয় সিনেমা ‘রইদ’।
রইদের গল্প
‘রইদ’ নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সুমন সিনেমার গল্পের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলেছেন। এর গল্প নিয়ে তিনি জানান, এই সিনেমার গল্পের সূত্র তার শৈশবে। ছোটবেলায় তার পরিচিত দুটি চরিত্রকে ঘিরেই ‘রইদ’-এর জন্ম। গল্পের অর্ধেক অংশীদার তার মা। শৈশব থেকেই এই গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছেন তিনি। সেই স্মৃতি, অনুভূতি আর লোকজ আখ্যানের মিশেলেই তৈরি হয়েছে ‘রইদ’। ‘রইদ’-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে সাদু, তার পাগল স্ত্রী এবং তাদের বাড়ির পাশের একটি তালগাছকে কেন্দ্র করে। হাজার বছরের পুরোনো এই লোকজ আখ্যানকে বর্তমান সময়ের ভাষায় নতুন করে নির্মাণ করার চেষ্টা করেছেন তিনি।

এই সিনেমার সেট তৈরি করার জন্য প্রায় ৫০ হাজার গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে সেই গাছগুলোর নিবিড় যত্ন নেওয়া হয়েছিল, পুরো এলাকাটি যেন সিনেমার সঙ্গে মিশে যায়। লোকেশনকে কেবল ব্যবহার নয়, বরং লোকেশনকে গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলতেই এই কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন নির্মাতা। এই সেট তৈরি করা মনে করিয়ে দেয় ইন্টারস্টেলারের ভুট্টা ক্ষেতের সেট এর কথা যার জন্য ক্রিস্টোফার নোলানও ভুট্টা গাছ লাগিয়েছিলেন।
বাংলাদেশী অতর সিনেমা নির্মাতা
নির্মাতা সুমনের এই সেট নির্মাণ একইসাথে গ্রামীণ বাংলার নান্দনিকতা, পরিবেশ তথা কৃষিসমাজেরই প্রতিফলন। যেখানে এমনকি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের শিল্পভাবনাও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্মাতা। এই নির্মাতার সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে গেলে আরেকটি বিষয় বেশ লক্ষ্যণীয় তা হলো ফেসবুকের কভার ফটো। সেখানেও রয়েছে এস এম সুলতানের আঁকা বাংলার কৃষকজীবনভিত্তিক শক্তিশালী একটি গ্রামীণ চিত্র যা নির্মাতা রেখেছেন প্রদর্শনী আকারে। ফলত, নির্মাতার সিনেমা, নিজস্ব ভাবনা সবকিছু জুড়েই রয়েছে বাংলার কৃষি, কৃষিভিত্তিক সমাজের চিত্র, এর থেকে উদ্ভব হওয়া লোকজ আখ্যান, কল্পনা, সংগ্রাম এমনকি প্রেমও। আর এটি নির্মাতা সুমনের নিজস্ব সিনেমাচিহ্ন যা তাঁকে ক্রমেই গড়ে তুলছে বাংলাদেশী অতর সিনেমা (Auteur) নির্মাতা হিসেবে।

‘রইদ’ ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে দেশে-বিদেশে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যামের ৫৫তম আসরে প্রিমিয়ার হয় সিনেমাটির। সেখানের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে স্থান পায় সিনেমাটি। যদিও জেতা হয়নি সেরার মুকুট তবে এর আগে রটারড্যামের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে দেশের কোন সিনেমা স্থান পায়নি।
‘রইদে আইলা গা জুড়াইতে’
রটারড্যামে প্রিমিয়ারের পর সিনেমাটি এখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে আসছে। আগামী ঈদুল আযহায় মুক্তি পাবে সিনেমাটি। এছাড়া সিনেমাটির মুক্তি উপলক্ষে প্রকাশ্যে এসেছে ‘রইদে আইলা গা জুড়াইতে’ শিরোনামের একটি গান। গানটি সিনেমাটির আবেদন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে দর্শকমনে।
এই সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি ও মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। সিনেমায় আরও অভিনয় করেছেন গাজী রাকায়েত ও আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদসহ অনেকে।
সিনেমাটি নির্মাতার প্রথম ফসল হাওয়াকেও ছাড়িয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা সুমন-হাওয়াভক্তদের।


