শিল্পী ডালিয়া নওশীন
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ডালিয়া নওশীন আর নেই। বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুর ১ টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে ডালিয়া নওশীনের বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। গণমাধ্যমকে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়েছেন শিল্পী ডালিয়ার খালাতো বোন নজরুল সংগীতশিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক। এই শোকগ্রস্ত দিনে যেনে নেয়া যাক শিল্পী ডালিয়া নওশীন যেভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ডালিয়া নওশীন বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। এছাড়াও বেশ অনেকদিন ধরেই তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। এবার তাঁর শারীরিক অবস্থার অবণতি হলে গত ২৭ মার্চ ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাঁকে। আজ দুপুরে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই শিল্পী শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
সাদিয়া আফরিন মল্লিক জানান, বাদ মাগরিব গুলশান সোসাইটি মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বনানী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হবে। ডালিয়া নওশীনের এক ছেলে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে, আরেকজন থাকেন স্পেনে। তাঁরা আসবেন কিনা তা জানা যায়নি।
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের মেয়ে

এছাড়াও এই প্রখ্যাত শিল্পীর পরিচয় তিনি দেশের প্রখ্যাত স্থপতি মাজহারুল ইসলামের মেয়ে। ডালিয়া ব্যক্তিজীবনে একজন বাংলাদেশি নজরুল সংগীতশিল্পী এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা। সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০২০ সালে একুশে পদক প্রদান করে।
তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক ও সংগীত অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।
শিল্পী ডালিয়া নওশীন যেভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিলেন
এই নিভৃতচারী শিল্পী পাঁচ বছর বয়সে সুধীন দাশের কাছে উত্তর ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীতে দীক্ষা নেন। ডালিয়া নওশিন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৪ বছরের কিশোরী ছিলেন। প্রিল মাসে পরিবারের সাথে তিনি কলকাতাতে চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে গঠিত ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’য় যোগদান করে কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেন।

২০১৮ সালে দেশের ইংরেজী পত্রিকা ডেইলি অবজারভারে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ডালিয়া নওশিন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগদানের স্মৃতি সামনে আনেন। সেখানে তিনি জানান ঢাকা থেকে প্রথমে কুমিল্লা যান। তারপর কুমি্ললার একটি গ্রাম থেকে তাদের রিকশায় করে ২২ মাইল যেতে হয়েছিল। আর রাস্তাটা তৈরি করেছিল ধানক্ষেতের পাশে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। এমনকি রিকশাচালকেরাও ছিল ভীষণ সাহসী। ২২ মাইল দূরত্বটা সামান্য ছিল না। এরপর তিনি জানান,”আমরা আগরতলার একটি আর্ট কলেজের শরণার্থী শিবিরে থেকেছিলাম। সেখানে কত শরণার্থী ছিল! সেখানে দুদিন থাকার পর আমরা কলকাতা চলে যাই। আমার এক মামা, কমল সিদ্দিকী, আমাকে ১৪৪, ধর্মতলা স্ট্রিট, লেনিন সরণির ঠিকানা দিয়ে পরদিন আসতে বললেন। আমরা সঞ্জিদা আপার সঙ্গে দেখা করি এবং ‘মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ নামে একটি দল তৈরি করি।
আমরা অনেক দেশাত্মবোধক গান গেয়ে ভারতীয়দের জানিয়েছিলাম কেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জরুরি ছিল। কিছু উল্লেখযোগ্য গান ছিল ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘জনতার সংগ্রাম’ ইত্যাদি। একদিন আমাদের একটি জায়গায় আমন্ত্রণ জানানো হয়; সেখানে একটি হারমোনিয়াম এবং একটি মাইক্রোফোন ছিল। পরে আমরা জানতে পারি যে স্টুডিওটি ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের।

যেভাবে একজন যোদ্ধা বন্দুকের ট্রিগার টানে
তিনি আরো জানান, “প্রথম দিনেই আমরা ৭টি গান গেয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমরা ১৫টি গান গাওয়ার পর, সেই গানগুলো ছিল সমবেতভাবে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত বাদ্যযন্ত্র ছিল না কিন্তু আমাদের গান অস্ত্রের মতো কাজ করেছিল। আমরা এমনভাবে গেয়েছিলাম যেন… যেভাবে একজন যোদ্ধা বন্দুকের ট্রিগার টানে। আমরা সুরের মধ্যে আমাদের হৃদয় উজাড় করে দিয়েছিলাম। স্বাধীনতার পর আমাদের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছিল। আমরা একটি সত্যিকারের পরিবারে পরিণত হয়েছিলাম।”


