১৫ টি ভ্রমণ স্থান
কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্য মানুষের আগ্রহ-উদ্দীপনা সম্ভবত মানবজাতির শুরু থেকেই। বলা যায়, ঘুরতে ঘুরতেই মানবরা আবিষ্কার করেছে ভিন্ন দেশ, ভিন্ন মহাদেশ। আধুনিক সময়ে ভ্রমণ স্থান চিত্ত-বিনোদনের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রতি দিনই মানুষ কোথাও না কোথাও ভ্রমণ করছে। তবে সাধারণত ভ্রমণের জায়গাগুলো নির্ধারিতই থাকে। তবে ভ্রমণের জায়গা আবিস্কারের ক্ষেত্রে সিনেমা, সিরিজ এক অন্যতম অনালোচিত মাধ্যম। সিনেমার সেট হিসেবে নির্মাতারা সব সময়ই চান গল্পের আঙ্গিকে জায়গা নির্বাচন করতে, নতুন নতুন স্থানের মাধ্যমে সিনেমার ভিজ্যুয়ালকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলতে। সিনেমায় দেখানো সেইসব জায়গাগুলোই ক্রমে হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ কিংবা সিনেমাপ্রেমীদের কাছে ঘুরতে যাওয়ার নিশানা। আজ চলচ্চিত্র ও টিভির মাধ্যমে বিখ্যাত হওয়া ১৫ টি ভ্রমণ স্থান নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
১৫. হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যাঞ্জারিন্স (২০২৫)
Gimnyeong Seongsegihaebyeon Beach (জেজু দ্বীপ, দক্ষিণ কোরিয়া)

নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় কে-ড্রামা, ‘হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যাঞ্জারিন্স’-এর এই জায়গাটিবেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার এই জেজু দ্বীপটি এখন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে।
১৪. উথারিং হাইটস (২০২৬)
Yorkshire Dales (নর্থ ইয়র্কশায়ার, ইংল্যান্ড)

এমেরাল্ড ফেনেল-এর উথারিং হাইটস সিনেমারএই জায়গাটি ইতিমধ্যেই ভ্রমণ উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে।
দ্য পয়েন্টস গাই-এর নিকি কেলভিন দ্য বলেন, “আবহাওয়া যাই হোক না কেন যান, এটি সুন্দর রোদেলা, তুষারময় বা বাতাসযুক্ত স্থান যেখনে প্রকৃত জাদু রয়েছে।”
১৩। থেলমা এন্ড লুইস (১৯৯১)
Dead Horse Point State Park (মোয়াব, ইউটাহ)

থেলমা এন্ড লুইস-এর চূড়ান্ত দৃশ্যে যখন দুজন নারী পালিয়ে যাচ্ছে, আত্মসমর্পণের বদলে স্বাধীনতাকে বেছে নিচ্ছে, যখন তাদের থান্ডারবার্ড গাড়িটি একটি চূড়া থেকে উপত্যকায় নেমে যাচ্ছে, চলচ্চিত্রের সবচেয়ে স্মরণীয় সমাপ্তি দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি।
ভক্তদের কাছে এটি এখন “দেলমা অ্যান্ড লুইজ পয়েন্ট” নামে পরিচিত।
১২. দ্য প্রিন্সেস ব্রাইড (১৯৮৭)
Cliffs of Moher (কাউন্টি ক্লেয়ার, আয়ারল্যান্ড)

চলচ্চিত্রে “ক্লিফস অফ ইনস্যানিটি” নামে পরিচিত, কাউন্টি ক্লেয়ারের আটলান্টিকের দিকে মুখ করা এই পাহাড়ি চূড়াগুলো ৩০০ মিলিয়ন বছরেরও বেশি আগে গঠিত হয়েছিল। প্রায় ৮.৭ মাইল দীর্ঘ এই উপকূলরেখা সমুদ্র থেকে সর্বোচ্চ ৭০২ ফুট উচ্চতায় উঠে।
আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোর একটি এটি। প্রতি বছর ১৫ লাখেরও বেশি পর্যটক আসে এখানে।
১১। দ্য ওডিসি (২০২৬)
Messinia (পেলোপনিস, গ্রিস)

ক্রিস্টোফার নোলান পরিচালিত হোমারের গ্রিক মহাকাব্য অনুকরণের চলচ্চিত্রটি জুলাই মাসের মুক্তির আগে থেকেই ভ্রমণপ্রেমীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। মেট ডেমনকে ওডিসিয়াস চরিত্রে দেখানো হয়েছে, এবং ছবিটির শুটিং ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি মরোক্কো, আইসল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডেও হয়েছে।
গ্রিসের গুরুত্বপূর্ণ শুটিং স্থানগুলোর মধ্যে ছিল পেলোপনিস অঞ্চল, যেখানে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর সেটিং হিসেবে অ্যাক্রোকোরিন্থ দুর্গ এবং ভয়ডোকিলিয়া বিচ ছিল। সিনেমার এই জায়গাটি ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনায়।
১০. দ্য বিচ (২০০০)
থাইল্যান্ডের কো ফি ফি লে দ্বীপে অবস্থিত মায়া বে (Maya Bay)

লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও অভিনীত অ্যাডভেঞ্চার ড্রামা চলচ্চিত্র ‘দ্য বিচ’-এ এই জায়গাটি প্রদর্শিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পর্দায় ধরা পড়া চাঁদাকৃতি এই স্বর্গীয় সমুদ্রসৈকতটি প্রত্যক্ষভাবে দেখার আকাঙ্ক্ষায় পর্যটকদের ঢল নামে সেখানে।
তবে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি অতিরিক্ত পর্যটনের ক্ষতিকর প্রভাবের এক প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রতিদিন প্রায় ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ পর্যটকের আগমনে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ফলে ২০১৮ সালে থাই কর্তৃপক্ষ এলাকাটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে, যাতে প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়।
চার বছর পর পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও, তখন থেকে বেশ কিছু কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সাঁতার নিষিদ্ধ করা, যাতে প্রবাল প্রাচীর এবং সেখানে বসবাসকারী ব্ল্যাকটিপ রিফ হাঙরের মতো সামুদ্রিক প্রাণী সুরক্ষিত থাকে।
৯. বিফোর সানরাইজ (১৯৯৫)
Café Sperl (ভিয়েনা)

বিফোর সানরাইজ ছবিটির আকর্ষণের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে শহরের ভেতর হাঁটা, কথা বলা এবং মাত্র এক রাতের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে একটি শহরকে আবিষ্কার করার মধ্যে। হঠাৎ করেই দেখা হওয়ার পর জেসি (ইথান হক) এবং সেলিন (জুলি ডেলপি) সময় কাটান ভিয়েনার ঐতিহ্যবাহী ক্যাফে স্পার্ল-এ, যা ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং পুরোনো ইউরোপীয় ভিয়েনার অনন্য আবহে পরিপূর্ণ।
৮. বিগ লিটল লাইজ (২০১৭)
Lovers Point Park (প্যাসিফিক গ্রোভ) এবং Bixby Bridge (বিগ সুর, ক্যালিফোর্নিয়া)

চলচ্চিত্র ও টিভির মাধ্যমে বিখ্যাত হয়েছে এই ‘বিগ লিটল লাইস’ সিনেমায় দেখানো ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় মনোরম অঞ্চল এর প্যাসিফিক গ্রোভ এবং বিগ সুর। এই সিরিজটির কারণে এই স্থানগুলোতে ভ্রমণপ্রেমীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
৭. ব্রেভহার্ট (১৯৯৫)
Trim Castle (কাউন্টি মিথ, আয়ারল্যান্ড)

যদিও কাহিনির পটভূমি স্কটল্যান্ডে, মেল গিবসন -এর অ্যাকাডেমি পুরস্কারজয়ী মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র ব্রেভহার্ট-এর বেশিরভাগ দৃশ্যই আয়ারল্যান্ডে ধারণ করা হয়েছিল। এর ফলে Trim Castle-এর মতো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো পর্দায় জীবন্তভাবে উঠে আসে।
আজও এই চলচ্চিত্রের ভক্তরা ১২শ শতাব্দীর এই ঐতিহাসিক দুর্গে ভ্রমণ করেন, অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও পর্দায় দেখানো সেই জগতে নিজেকে কল্পনা করার আশায়।
৬। ব্রেকিং ব্যাড (২০০৮)
Twisters Burgers and Burritos (আলবুকার্ক, নিউ মেক্সিকো)

ব্রেকিং ব্যাড-এ ওয়াল্টার হোয়াইটের শেষ অধ্যায়ের এক দশকেরও বেশি সময় পরেও আলবুকার্ক ভক্তদের জন্য এক ধরনের তীর্থস্থান উঠেছে। অনেক দর্শকই বিশেষভাবে যান Twisters Burgers and Burritos-এর ইস্লেটা বুলেভার্ড শাখায়, যা সিরিজে গাস ফ্রিংয়ের “লস পোল্লোস হারমানোস” হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
তবে বাড়িটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হওয়ায় দর্শনার্থীদের প্রতি অনুরোধ থাকে যেন তারা যথাযথ সম্মান ও সংযম বজায় রাখেন।
৫। ব্রিজারটন (২০২০)
Royal Crescent (বাথ, ইংল্যান্ড)

ব্রিজার্টন-এর জনপ্রিয়তা যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বজুড়ে ফ্যাশন, জীবনধারা, নকশা এবং ভ্রমণ প্রবণতায় গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা “ব্রিজার্টন ইফেক্ট” নামে পরিচিত।
এই সিরিজের সবচেয়ে পরিচিত লোকেশনগুলোর একটি হলো ‘রয়্যাল ক্রিসেন্ট’ প্রায় ৫০০ ফুট দীর্ঘ জর্জিয়ান ধাঁচের বাড়ির সারি, যেখানে কল্পিত ফেদারিংটন পরিবারকে বসবাস করতে দেখা যায়, বিশেষ করে নাম্বার ১ রয়্যাল ক্রেসেন্টে।
৪। ক্লোজ এনকাউন্টারস অফ দ্য থার্ড কাইন্ড (১৯৭৭)
Devils Tower (ওয়াইওমিং)

উত্তর-পূর্ব ওয়াইওমিংয়ের বেল ফোরশ নদী উপত্যকার ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ১,২৬৭ ফুট উঁচু ডেভিলস টাওয়ার ন্যাশনাল মনুমেন্টটি স্টিভেন স্পিলবার্গের ক্লোজ এনকাউন্টার্স অব দ্য থার্ড কাইন্ড ছবির শেষ অংশে ভিনগ্রহীদের অবতরণস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর একটি জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রতীকে পরিণত হয়।
এর দৃষ্টিনন্দন খাড়া স্তম্ভসদৃশ গঠন এবং ভিন্নজগতের মতো অবয়ব আজও ব্ল্যাক হিলস অঞ্চলে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। হাইকিংপ্রেমী, পর্বতারোহী এবং সায়েন্স ফিকশন অনুরাগীরা নিয়মিতই এখানে ভিড় জমান এই অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময় কাছ থেকে দেখার জন্য।
৩. ডুন (২০২১)
Wadi Rum (জর্ডান)

লাল-সোনালি বালি এবং বালি-পাথরের পাহাড়ে ঘেরা এই উপত্যকা ছিল ডুন এবং ডুন: পার্ট টু -এর আররাকিসের অনেক দৃশ্যের পটভূমি। “হলিউডের মরুভূমি” নামে খ্যাত ওয়াদি রাম একটি সংরক্ষিত এলাকা, যা ইউনেস্কো ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানও। এছাড়াও এই স্থানটিকে Lawrence of Arabia, Prometheus, The Martian এবং লাইভ-অ্যাকশন Aladdin-এ দেখা গেছে।
চলচ্চিত্র ও টিভির মাধ্যমে বিখ্যাত এই জায়গাটি নিয়ে জর্ডান ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে যে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রযোজনাগুলো পর্যটকদের আগমনকে ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে। ডুন ছবিগুলোতে আবুধাবির লিওয়া মরুভূমিতেও বালির ঢিবির দৃশ্য শুট করা হয়েছে, যেখানে অভিনেতা ও কর্মীরা Qasr Al Sarab Desert Resort by Anantara-এ অবস্থান করেছিলেন। এবছরের শেষের দিকে মুক্তি পাওয়া ডুন: পার্ট থ্রি তে আবুধাবির মরুভূমির ল্যান্ডস্কেপ আবার দেখা যাবে।
২. ইট প্রে লাভ (২০১০)
Tegallalang Rice Terraces (উবুদ, বালি, ইন্দোনেশিয়া)

ইট প্রে লাভ-এর আত্ম-আবিষ্কারের তিন অধ্যায়ে ইতালি, ভারত এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে যাত্রা ঘটে। “লাভ” অধ্যায়ে বালির মনোরম Tegallalang Rice Terraces দৃশ্যমান হয়, যেখানে লিজকে (জুলিয়া রবার্টস অভিনীত চরিত্র) ঘূর্ণায়মান পথ ধরে সাইকেল চালাতে দেখা যায়।
সবুজে ঘেরা স্তরবিন্যাস ধান ক্ষেতগুলো শহর উবুদ থেকে প্রায় ৩০ মিনিট উত্তরে অবস্থিত এবং আগে এটি ছিল এক শান্ত, কম পরিচিত পর্যটনগন্তব্য। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর থেকে এই এলাকা আত্মিক শান্তি, স্বাস্থ্যভিত্তিক জীবনধারা এবং আত্ম-আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা খোঁজা ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
১। দ্য ম্যান উইথ গোল্ডেন গান (১৯৭৪)
Ko Ta Pu (ফ্যাং নাগা বে, থাইল্যান্ড)

দ্য ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান-এ ফ্রান্সিসকো স্কারামাঙ্গার-এর লুকানোর স্থান হিসেবে পর্দায় প্রদর্শিত হওয়ার পর, কো টা পু—ফ্যাং নাগা বে থেকে ৬৬ ফুট উঁচু চুনাপাথরের একটি রক—“জেমস বন্ড আইল্যান্ড” নামে খ্যাত হয়ে যায়।
আজ এটি থাইল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র, যেখানে পর্যটকরা কায়াকিং, স্নোরকেলিং এবং আশেপাশের সমুদ্রগুহাগুলো অন্বেষণ করার জন্য ভিড় জমান।
চলচ্চিত্র ও টিভির মাধ্যমে বিখ্যাত হওয়া এই ১৫ টি ভ্রমণ স্থান ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এখন নতুন দিগন্ত। চাইলে যেতে পারেন আপনিও!


