রমজান মাস
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র মাহে রমজান মাস (চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল)। রমজানের চাঁদ দেখা যাওয়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। সেহরির প্রস্তুতি, নামাজ, সারাদিন ইবাদত, ইফতারের তালিকা, মসজিদমুখী মানুষের ব্যস্ততা। কিন্তু এই মাসের আসল সৌন্দর্য শুধু খাবারের সময়সূচি বদলে যাওয়ায় নয়; বরং মন ও জীবনের ছন্দ বদলে যাওয়ায়। মাহে রমজান আমাদের সামনে নিয়ে আসে থামার, ভাবার এবং নিজের ভেতরটা নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ।
রমজান এলে জীবনের গতি একটু বদলে যায়। দিনের আলোয় ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকলেও মন যেন অদ্ভুত এক প্রশান্তির খোঁজে থাকে, নিজেকে নতুন করে গড়ার, ভেতরটা পরিষ্কার করার তাগিদ তৈরি হয়। রমজান শুধু না খেয়ে থাকার নাম নয়; বরং এটি নিজের ইচ্ছাকে শাসন করার প্রশিক্ষণ। অন্যের কষ্ট বুঝে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা, আর আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ।
আল্লাহ তাআলা রোজার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন: “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি/পরহেজগারি) অর্জন করতে পারো।” (কুরআন, সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)
তাকওয়া মানে কেবল ভয় নয়, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ন্যায়ের পথে থাকা, গোপনে-প্রকাশ্যে আল্লাহকে মনে রেখে চলা। রমজান সেই তাকওয়ার ভিত গড়ে দেয়।
সংযম: ক্ষুধার চেয়েও বড় পরীক্ষা
রোজা আমাদের শেখায়, সব ইচ্ছা পূরণ করাই জীবন নয়; কখনও থামতে পারাটাই বড় ক্ষমতা। খাবার দাবার তো একটি দিক, কিন্তু রোজার আসল সৌন্দর্য থাকে আচরণে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রোজা ঢালস্বরূপ অর্থাৎ রক্ষাকবচ। (সহিহ বুখারি/মুসলিম)
তাই রোজা মানে শুধু পেট খালি রাখা নয়; রাগ সংযত করা, মিথ্যা থেকে দূরে থাকা, কটু কথা না বলা, গীবত-পরনিন্দা বর্জন করা, এগুলোই রোজার আত্মা।
এ মাসে দিনের বেলা হালকা ক্লান্তি আসে, কিন্তু সেই ক্লান্তিই মনে করিয়ে দেয়, আমি চাইলে নিজের অভ্যাস ভাঙতে পারি। রাতের ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, সব মিলিয়ে রমজান একটা “রিসেট বাটন” হয়ে ওঠে।
কুরআনের মাস: হৃদয়ের জন্য দিকনির্দেশ
রমজানকে আলাদা করে মহান করেছে কুরআন। আল্লাহ বলেন, “রমজান মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য পথনির্দেশ…” (কুরআন, ২:১৮৫)
অনেকে রমজানে বেশি তিলাওয়াত করেন । তবে শুধু পাঠ নয়, বোঝার চেষ্টা আর জীবনে প্রয়োগ, এই দুইটা যুক্ত হলে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্কটা বাস্তব হয়। রমজান আমাদের ভেতরে সেই আগ্রহ জাগায় – আমি কীভাবে আরও সত্যবাদী হব? আরও ন্যায্য হব? আরও কোমল হব?
আর আছে লাইলাতুল কদর, যে রাতকে কুরআন “হাজার মাসের চেয়েও উত্তম” বলেছেন (কুরআন, সূরা আল-কদর ৯৭:৩)। এই বার্তাটা আসলে আশা জাগায়, অল্প সময়েও আল্লাহ চাইলে অনেক কিছু বদলে দিতে পারেন।
আত্মশুদ্ধি: তওবা, ক্ষমা, নতুন শুরু
রমজানে মানুষ সাধারণত নিজের ভুলগুলো বেশি টের পায়। এটাই বড় অর্জন, কারণ ভুল ধরা মানে শুধরে নেওয়ার পথ খুলে যাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি/সহিহ মুসলিম)
এখানে “পূর্বের গুনাহ” বলতেই আমরা যেন অহেতুক আত্মতুষ্টিতে না ভুগি; বরং এটাকে বুঝি, যে রমজান আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার মৌসুম, তবে শর্ত হলো আন্তরিকতা, অনুশোচনা, সংশোধনের চেষ্টা।
মানবতার মাস: ক্ষুধা শেখায় সহমর্মিতা
রমজানের সবচেয়ে মানবিক দিক হলো, ক্ষুধা মানুষকে নরম করে। যারা প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, যাদের ঘরে খাবার কম, তাদের কষ্ট একদিনের রোজা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। কুরআন বারবার দান-সহায়তার কথা বলে; যেমন আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের ব্যয়ের বহু গুণ প্রতিদান হয় (কুরআন, ২:২৬১)।
ইফতার ভাগ করে খাওয়া, গরিব-অসহায়কে সহায়তা করা, যাকাত-ফিতরা আদায়, এগুলো রমজানের সৌন্দর্য বাড়ায়। ফিতরার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, এটা রোজাদারকে ভুল-ত্রুটি থেকে পরিশুদ্ধ করে এবং দরিদ্রকে খাদ্য দেয়। (সুনানে আবু দাউদ/ইবনে মাজাহ)
এ মাসে “মানবতা” শুধু দানেই সীমিত থাকে না, কথাবার্তায়ও মানবতা লাগে। পরিবারের সঙ্গে ধৈর্য, প্রতিবেশীর প্রতি খেয়াল, কর্মক্ষেত্রে সততা, এসবও ইবাদতেরই অংশ।
রমজান শেষে কী থাকবে?
রমজান চলে যায়, কিন্তু রেখে যায় একটা প্রশ্ন। আমি কি একটুও বদলেছি? রোজার মূল লক্ষ্য যদি তাকওয়া হয় (২:১৮৩), তাহলে রমজানের পরও সংযম, সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা, এগুলো টিকে থাকাই আসল সফলতা। রমজান আমাদের শেখায়, মানুষ চাইলে নিজেকে বদলাতে পারে, ধীরে ধীরে, প্রতিদিন একটু একটু করে।
রমজান তাই সত্যিই আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবতার মাস। রমজানে ইবাদতের মাধ্যমে হৃদয় পরিশুদ্ধ হয়, সংযমের মাধ্যমে চরিত্র দৃঢ় হয়, আর সহমর্মিতার মাধ্যমে সমাজটা একটু বেশি মানবিক হয়ে ওঠে ।


