সংগ্রামী যাত্রায় শিল্প-সাহিত্য …..
সংগ্রামী যাত্রায় শিল্প-সাহিত্য কীভাবে মানুষের চেতনা, প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক জাগরণকে প্রভাবিত করে এই পর্বে “চিত্রালী আলাপ” এ বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা।
সংগ্রামের সময় মানুষ শুধু স্লোগান দেয় না, মানুষ কথার বাইরে আরেকটা ভাষা খুঁজে নেয়। সেই ভাষাটা হলো গান, কবিতা, পোস্টার, কার্টুন, নাটক, দেয়াললিখন, এক কথায় শিল্প-সাহিত্য। “চিত্রালী আলাপ”-এর এই পর্বে আমরা বুঝতে চাই, সংগ্রামী যাত্রায় শিল্প-সাহিত্য কীভাবে মানুষের চেতনা জাগায়, ভয় ভাঙায়, আর প্রতিবাদের মুখ তৈরি করে।
আন্দোলনের মাঠে শিল্প
আন্দোলনের মাঠে শিল্পের প্রথম কাজ হলো বিক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতাকে এক জায়গায় এনে মানে দেওয়া। একজন একা যা অনুভব করে, গান বা কবিতায় সেটা “আমরা”-তে বদলে যায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময়ও তা দেখা গেছে, ঢাকার দেয়ালে গ্রাফিতি, হাতে আঁকা পোস্টার, স্মরণ-চিহ্ন আর প্রতীক মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দেয়ালই যেন “ডায়েরি” হয়ে উঠেছিল। অনেক লেখা-ছবি ছিল সরাসরি প্রতিবাদের ভাষা, আবার কিছু ছিল শোক, ক্ষোভ ও আশা, সব মিলিয়ে একটা দৃশ্যমান ইতিহাস।
দ্বিতীয় কাজ হলো প্রতিবাদের বার্তা সহজ করা। গবেষণার ভাষা সবাই বোঝে না, কিন্তু একটা পোস্টার, একটা কার্টুন, বা দুই লাইনের কবিতা মুহূর্তে মানুষের মাথায় ঢুকে যায়। ২০২৪ সালের আন্দোলনে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কার্টুন-কমিকস, রাস্তার পোস্টার ও গ্রাফিতি, সবই ছিল দ্রুত ছড়ানো “ভিজ্যুয়াল স্লোগান”।
তৃতীয় কাজ হলো সংস্কৃতিক জাগরণ, আন্দোলনকে কেবল রাজনৈতিক নয়, সামাজিক-মানবিক করে তোলা। যখন রাস্তায় শুধু শ্লোগান নয়, গানও বাজে; যখন দেয়ালে শুধু দাবিই নয়, স্মৃতিও আঁকা থাকে, তখন আন্দোলন দীর্ঘশ্বাসের জায়গা থেকে সম্মিলিত স্বপ্নে রূপ নেয়। বাংলাদেশের জুলাই-আগস্ট ২০২৪ পর্বে গ্রাফিতি ও সংগীতের এই “সংস্কৃতিক পড়া” নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন বিশ্লেষণাত্মক লেখায়।
এই দৃশ্যটা শুধু বাংলাদেশে না, বিশ্বজুড়েই। কেনিয়ার ২০২৪ এর যুব নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে র্যাপ, স্পোকেন-ওয়ার্ড, দেয়ালচিত্র, স্ট্রিট পারফরম্যান্স আন্দোলনের ভাষা তৈরি করেছে, দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্মৃতি ও সাক্ষ্য।
সংগ্রামে শিল্প-সাহিত্য “সাজ” নয়, এটা অস্ত্রও না, শুধু হাতিয়ারও না; এটা মানুষের ভেতরকার ভয়কে নাম দিয়ে বের করে আনে, অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস তৈরি করে, আর ইতিহাসকে চোখে দেখা যায় এমন করে তোলে। “চিত্রালী আলাপ” এ তাই শিল্প-সাহিত্যকে আমরা দেখি আন্দোলনের হৃদস্পন্দন হিসেবে যেখানে প্রতিবাদ শুধু উচ্চারণ নয়, মানুষ হয়ে ওঠার চর্চা।

