চিলির গণভোট
প্রাচীন ইনকা সভ্যতার অংশ ছিলো লাতিন আমেরিকার দেশ চিলি। ষোড়শ শতাব্দী তথা ১৫৪১ আগে থেকেই চিলিকে দখল করে নেয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয় স্পেনীয়দের। সে যাত্রায় তারা সফলও হয়। এবং ১৮১৮ সালে এসে সেই উপনিবেশিক যাত্রা থামে স্পেনের। বের্নার্দো ও’হিগিন্স-এর নেতৃত্বে চিলি পায় স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পর নানা চরাই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে চিলির পরবর্তী ১০০ বছর। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় শুরু হবে চিলির সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠন ও এর পরের এক সামরিক শাসন নিয়ে। যেই সামরিক শাসনের গল্পে গল্পে উঠে আসবে একটি গণভোট ও সে সম্পর্কিত একটি সিনেমার কাহিনি। চিলির গণভোট নিয়ে সিনেমা ‘নো’ এর প্রেক্ষাপট ও সিনেমার গল্পটি চলুন কিছুটা জেনে নেয়া যাক।
১৯৬০-এর দশকে থেকেই চিলি ছিলো বেশ গণতান্ত্রিক। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে বামপন্থী জোটের প্রার্থী সালভাদর আয়েন্দে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম মার্ক্সবাদী রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি দরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়ন, ভূমি সংস্কার ও তামা শিল্প জাতীয়করণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

দেশের সম্পদ পুনর্বণ্টনের এই চেষ্টা শুরুতে ভালো ফল বয়ে আনলেও শিগগিরই মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে যার অন্যতম কারণ ছিলো আন্তর্জাতিক বিরোধিতা। ফলে বেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে আয়েন্দে সরকার।
আয়েন্দে সরকারের পতন
১৯৭২ সালের মধ্যেই দেশজুড়ে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তবে এই অবস্থায়ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আয়েন্দের জোটই জয়ী হয়। এই জয়ের পর তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনী এক পরিকল্পিত সেনা অভ্যুত্থান ঘটায়। এর নেতৃত্বে ছিলেন চিলির সেনাপ্রধান জেনারেল অগাস্তো পিনোশে। এই সেনা অভ্যুত্থানে সালভাদর আলেন্দে আত্মসমর্পণ না করে সরকারী প্রাসাদেই আত্মহত্যা করেন।
চিলির ক্ষমতা দখল করে নেয় জেনারেল অগাস্তো পিনোশে। দেশ চলে যায় সামরিক বাহিনীর হাতে। এই ক্ষমতা পরিবর্তনের পর দেশটির জাতীয় পুলিশ হাজার হাজার আয়েন্দে সমর্থককে হত্যা করে। এই হত্যাকান্ড লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানের পরের ইতিহাসে এক কলঙ্কতম অধ্যায়।
ধারণা করা হয় প্রায় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার মানুষ নিহত হয় দেশটির জাতীয় পুলিশের হাতে। অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।
চিলির সামরিক শাসনের শুরু
সেনা অভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান জেনারেল অগাস্তো পিনোশে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে দেশে দ্রুতই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং তাদের এই ক্ষমতা আরোহণ সাময়িক। কিন্তু সেনাপ্রধান ধীরে ধীরে নিজের হাতে পুরো ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন। তিনি বিরোধীদের দমন করতে ডিনা (ডিআইএনএ-দিরেকসিওন নাসিওনাল দে ইন্তেলিহেনসিয়া) নামে একটি গোয়েন্দা সংস্থা গঠন করেন। ১৯৭৫-৭৬ সালে এই সংস্থাটি মানুষের উপর হত্যাকান্ড ও ব্যাপক নিপীড়ন চালায়।

১৯৭৪ সালে পিনোশে প্রেসিডেন্ট বনে যান। তিনি দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করা একদল অর্থনীতিবিদের পরামর্শ নেন যাদের বলা হয় ‘শিকাগো বয়েজ’। তারা বাজারমুখী অর্থনীতির নীতি প্রণয়ন করেন। এতে কিছু মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও অধিকাংশ চিলিয়ান মজুরি কমে যাওয়ায় কষ্টে দিন কাটাতে থাকে। পরে সামগ্রিকভাবেই অর্থনীতি খারাপের দিকে যায়।
পিনোশের এই ক্ষমতা দখলে মার্কিন সমর্থন থাকলেও পরে পিনোশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এক হত্যাকাণ্ডের কারণে। ১৯৭৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসির শেরিডান সার্কেল এলাকায় একটি গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন অরল্যান্ডো লেটেলিয়ের ও তাঁর মার্কিন সহকারী রনি কার্পেন মফিট। লেটেলিয়ের ছিলেন চিলির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি সালভাদর আয়েন্দের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ১৯৭৩ সালে আয়েন্দে সরকার উৎখাত হওয়ার পর লেটেলিয়ের গ্রেপ্তার হন, নির্যাতনের শিকার হন এবং পরে তাঁকে নির্বাসিত করা হয়।
নির্বাসনে যাওয়ার পর লেটেলিয়ের যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাস করতেন। সে সময় তিনি পিনোশে সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন, দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছিলেন। তিনি ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী থিঙ্ক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজে (আইপিএস) কাজ করতেন। চিলির সামরিক সরকারের চোখে লেটেলিয়ের ছিলেন একজন শত্রু।

তাঁর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করে মার্কিন সরকার। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে হামলাটি ছিল চিলির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিনার পরিকল্পিত অপারেশন। হামলার পরিকল্পনা ও নির্দেশ এসেছিল পিনোশে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই। এর বাস্তবায়নে যুক্ত ছিল কিউবান বংশোদ্ভূত চরম ডানপন্থী কিছু সন্ত্রাসী।
চিলি, পিনোশ ও মার্কিন সরকার
এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পিনোশের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও পিনোশে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালায়। তীব্র সমালোচনা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পিনোশে ১৯৮০ সালে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন। এতে বলা হয়, ১৯৮৮ সালে জনগণ গণভোটে সিদ্ধান্ত নেবে তিনি আরেক দফা ক্ষমতায় থাকবেন কি না। কিন্তু তত দিনে নিপীড়ন, নির্যাতন ও অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থার কারণে দেশের মানুসের খোভ বাড়তে থাকে। বেকারের সংখ্যা বাড়ে। শুরু হয় জনবিক্ষোভ। এমনকি ধনীদের এলাকাতেও নারীরা খালি হাঁড়ি বাজিয়ে প্রতিবাদ জানায়। রাজনৈতিক দলগুলো গোপনে সংগঠিত হতে শুরু করে। পিনোশেও টিকে থাকতে আবারও সেনা টহল, কারফিউ, ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়।
তিনি ১৯৮৬ সালে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এরপর ১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর ঘোষণা করা হয় গণভোটের। এটি ছিল দেশটির সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে ফেরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। গণভোটে ভোটারদের দুটি পন্থা ছিল—‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোট। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে জেনারেল অগাস্তো পিনোশে আরও আট বছর ক্ষমতায় থাকবেন। আর ‘না’ ভোটের অর্থ ছিল ১৯৮৯ সালেই সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
চিলির গণভোট নিয়ে সিনেমা ‘নো’
এই গণভোটকে কেন্দ্র করেই ২০১২ সালে নির্মাণ করা হয় সিনেমা ‘নো’। এটি পরিচালনা করেছেন পাবলো লারাইন।
সিনেমার গল্পটি হচ্ছে এক তরুণ বিজ্ঞাপনকর্মীকে নিয়ে। তাঁর ওপর দায়িত্ব ছিল গণভোটে ‘না’ ভোট নিয়ে প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন তৈরি করা। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মাত্র ১৫ মিনিট এই প্রচারণার সুযোগ দিয়েছিল। টিভি প্রচারণায় কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করা হয়, সেটাই এই সিনেমার মূল বিষয়। সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলো। এতে অভিনয় করেছেন রেনে সাভেদ্রা (গায়েল গার্সিয়া বার্নাল)।

সিনেমার গল্পে দেখা যায় রেনে সাভেদ্রাকে গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো দলের পক্ষ থেকে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তার রক্ষণশীল বস এতে খুশি না হলেও রেনে কাজ করতে রাজী হন। কাজ শুরু করে তিনি। একটা সময় লক্ষ্য করেন, ‘না’ পক্ষের বিজ্ঞাপনগুলো শুধু পিনোশের সময়ের নির্যাতন আর দমন-পীড়নের ভয়ংকর ছবি তুলে ধরা হচ্ছে। রেনে সাভেদ্রা মনে করলেন, এ রকম বিজ্ঞাপন মানুষের মনে কোন আশার আলো দেখাতে পারছে বরং পুরনো সেই ভয়-ভীতি জাগিয়ে তুলছে।
এরপর রেনে বিকল্প ভাবনা হাজির করেন। তিনি প্রস্তাব দেন যে, ভয় নয়, বরং আনন্দ, আশা আর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। শুরুতে অনেকে আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর কথাই মেনে নেয় সবাই। পরিকল্পনা মতে টানা ২৭ রাত টেলিভিশনে দুই পক্ষ থেকেই বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। ‘না’ পক্ষের বিজ্ঞাপনগুলো ছিল সৃজনশীল, প্রাণবন্ত ও সাধারণ মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য ও আশার আলো দেখানো। অতীতের দুঃস্বপ্ন বাদ দিয়ে ‘না’ ভোট দিলে যে সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ পাওয়া যাবে সেই স্বপ্ন দেখানো হয়। অন্যদিকে ‘হ্যাঁ’ পক্ষের প্রচার ছিল একঘেয়ে ও কড়া ভাষার, যা তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিজ্ঞাপন ছাড়াও বড় সমাবেশ, কনসার্ট ও আন্তর্জাতিক তারকাদের সমর্থন দেওয়া ভিডিও ‘না’ প্রচারণাকে আরও জোরালো করে তোলে। ‘হ্যাঁ’ পক্ষ তখন বাধ্য হয়ে তাদের বিজ্ঞাপনের ধরন নকল করতে শুরু করে।

পিনোশের ভাগ্যে কি জুটেছিলো?
সিনেমায় প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকৃত আর্কাইভ ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে, যার মধ্যে নিউজ ব্রডকাস্ট এবং আসল বিজ্ঞাপনগুলোও ছিলো। এরপর কাঙ্ক্ষিত গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং পিনোশে সরকারের পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হেরে যাওয়া ঠেকাতে নেয়া ভোট স্থগিত বা বাতিল করে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করার পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে এই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এবং পিনোশে সামরিক সরকার বাধ্য হয় গণভোটের ফলাফল মেনে নিতে। যার কারণে পিনোশে মধ্যে ১৯৮৯ সালে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। তবে ১৯৯০ সালের ১১ মার্চ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীভাবে দায়িত্বে ছিলেন পিনোশ। পিনোশের সমর্থকেরা ১৯৮৫-৮৯ সময়ের অর্থমন্ত্রী হারনান বুচিকে প্রার্থী করে। তবে সেই নির্বাচনে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট নেতা পাত্রিসিও আয়লউইন বিজয়ী হন। ১৯৯০ সালের ১১ মার্চ তিনি প্রেসিডেন্ট হন। এভাবে চিলি ধীরে ধীরে পূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরে যায়। এরপর পিনোশের ভাগ্যে কি জুটেছিলো সে গল্প আরেকদিন।


