শবে বরাত বা শাবান মাস
ইসলামি শরিয়তের আলোকে ‘শবে বরাত’ বা ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ (শাবান মাসের মধ্য রজনী) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পবিত্র কুরআনে শবে বরাত বলে কোন উল্লেখ্য নেই তবে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ আছে অর্থাৎ, পূর্ণ বাক্যটির অর্থ দাঁড়ায় “শাবান মাসের মধ্যভাগের রাত”। চলুন জানি শবে বরাত বা শাবান মাসের মধ্য রজনী পালনের বৈচিত্র্যময় ইতিহাস।
হাদিস শরিফে এই রাতকে মূলত ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ হিসেবেই সম্বোধন করা হয়েছে। পারস্য বা ইরানীয় প্রভাবে পরবর্তীতে আমাদের এই অঞ্চলে ‘শবে বরাত’ নামটি প্রচলিত হয়। আরবিতে একে ‘লাইলাতুল মোবারাকাহ’ (বরকতময় রাত) হিসেবেও কেউ কেউ উল্লেখ করেন। যদিও অধিকাংশ আলেম মনে করেন কুরআনে বর্ণিত ‘মোবারক রাত’ বলতে লাইলাতুল কদরকেই বোঝানো হয়েছে।
শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে বেশ কিছু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যদিও কোনো কোনো হাদিসের সূত্র (সনদ) নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা আছে, তবে সামগ্রিকভাবে এই রাতের গুরুত্ব স্বীকৃত।
• আল্লাহর ক্ষমা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা শাবান মাসের মধ্যরাত্রিতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” (ইবনে মাজাহ, তাবারানি ও সহিহ ইবনে হিব্বান)।
• ইবাদত ও দোয়া: আলি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এই রাতে ইবাদত করা এবং দিনে রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে, যদিও এই বর্ণনাটির সনদ কিছুটা দুর্বল বলে বিবেচিত। তবে নফল ইবাদত হিসেবে এর গুরুত্ব অনেক।
শবে বরাত বা শাবান মাসের মধ্য রজনী পালনের ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগে এই রাতের ফজিলত ও ইবাদত থাকলেও বর্তমান সময়ের মতো ‘উৎসবমুখর’ বা ‘সামাজিকভাবে প্রচলিত’ রূপটি পরবর্তীকালে ধাপে ধাপে বিকশিত হয়েছে।
এর প্রচলন ও বিবর্তনের ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো:
১. প্রাথমিক যুগ (রাসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এই রাতটি মূলত ব্যক্তিগত ইবাদত ও তওবার রাত ছিল। রাসুল (সা.) নিজে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করতেন এবং নির্জনে দীর্ঘ ইবাদত করতেন। সাহাবায়ে কেরামও ব্যক্তিগতভাবে এই রাতে নফল ইবাদত ও দোয়া করতেন। তবে তখন বর্তমানে প্রচলিত আলোকসজ্জা, হালুয়া-রুটি বা ঘটা করে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।
২. তাবেয়ীদের যুগ (সিরিয়া অঞ্চল)
শবে বরাতের আনুষ্ঠানিক প্রচলনের একটি বড় সূত্র পাওয়া যায় সিরিয়া (শাম) অঞ্চলের প্রখ্যাত তাবেয়ীদের মাধ্যমে।
• খালিদ ইবনে মাদান এবং মাকহুল (রহ.)-এর মতো সিরিয়ার কিছু প্রখ্যাত আলেম এই রাতে মসজিদে জমায়েত হয়ে সুন্দর পোশাক পরে সুগন্ধি মেখে ইবাদত করার সূচনা করেন।
• তাদের এই কার্যক্রম থেকেই মূলত এই রাতটি সামাজিকভাবে উদযাপনের ধারণাটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তবে মদিনা বা হিজাজ অঞ্চলের আলেমরা তখন একে সমর্থন করেননি এবং ব্যক্তিগত ইবাদতেই সীমাবদ্ধ থাকতে বলেছেন।
৩. মসজিদে জামাতে নামাজের সূচনা (৪৪৮ হিজরি)
ইতিহাসবিদদের মতে, শবে বরাতে মসজিদে ঘটা করে বিশেষ জামাতে নামাজ পড়ার প্রথা অনেক পরে শুরু হয়।
• বায়তুল মোকাদ্দাস (জেরুজালেম): ৪৪৮ হিজরিতে জেরুজালেমের মসজিদে ইবনুল আবু হামরা নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই রাতে সালাতুত তাসবিহ বা বিশেষ দীর্ঘ নামাজের জামাত শুরু হয়। সাধারণ মানুষ এর আগে এভাবে শবে বরাতে জামাতে শামিল হতো না। কালক্রমে এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।
৪. ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচার ও প্রসার
আমাদের এই অঞ্চলে (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান) শবে বরাতের বর্তমান রূপটি আসার পেছনে কয়েকটি প্রভাব কাজ করেছে:
• পারস্য বা ইরানীয় প্রভাব: মধ্য এশিয়া থেকে আসা সুফি ও শাসকদের মাধ্যমে পারস্যের অনেক সংস্কৃতি আমাদের এখানে প্রবেশ করে। পারস্যে আলোর উৎসব বা উৎসবমুখর রাত পালনের যে সংস্কৃতি ছিল, তার কিছু অংশ শবে বরাতের উদযাপনের সাথে যুক্ত হয় (যেমন: মোমবাতি জ্বালানো বা আলোকসজ্জা)।
• মুঘল আমল: মুঘল সম্রাটদের আমলে ধর্মীয় উৎসবগুলোকে রাজকীয় আভিজাত্যের সাথে পালন করা হতো। তখন থেকেই তোপধ্বনি, আতশবাজি এবং মিষ্টি বা হালুয়া বিলানোর মতো প্রথাগুলো ব্যাপক আকারে শুরু হয়।
প্রচলিত কিছু প্রথার পেছনের কারণ
• হালুয়া-রুটি: এর কোনো সরাসরি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। তবে একসময় দান-খয়রাতের উদ্দেশ্যে এই রাতে খাবার রান্না করা হতো। কালক্রমে তা একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে।
• আলোকসজ্জা ও আতশবাজি: এটি মূলত আনন্দ প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে ঢুকে পড়েছে, যা অনেক আলেম ‘বেদআত’ বা অপচয় হিসেবে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

